অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার: সুবিধার আড়ালে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৩:৪৫, ২ জানুয়ারি ২০২৬

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার: সুবিধার আড়ালে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

এ ধরনের খাবার মুখরোচক হলেও এর আড়ালে পুষ্টিহীনতার গভীর সংকট লুকিয়ে রয়েছে। যা সহজেই বুঝতে পারা যায় না। মূলত, প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো ‘ইম্পটি ক্যালোরি’, যেখানে ক্যালোরি প্রচুর পরিমাণ থাকলেও ফাইবার, ইসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড বা মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট (ভিটামিন ও মিনারেল) থাকে না। এ কারণে পেট ভরা অনুভব হলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে থাকে শরীর। অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ‘ইনট্রোডাকশন টু হিউম্যান নিউট্রিশন’ এবং ‘সাইজার, এফ. ও হুইটনি, ই. নিউট্রিশন: কনসেপ্টস অ্যান্ড কন্ট্রোভার্সিস; সেনগেজ লার্নিং’ বই দুটির রেফারেন্সে লিখেছেন রাজধানীর প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী জান্নাত প্রেমা।

পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত যোগ করা চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এবং স্বাদ বাড়াতে বিভিন্ন কৃত্রিম রং, ফ্লেভার ও প্রিজারভেটিভস মেশানো হয়। এসব খাবারে প্রাকৃতিক আঁশ, ভিটামিন ও মিনারেলের পরিমাণ খুবই কম থাকে অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় তা নষ্ট হয়ে যায়। আঁশের অভাবের কারণে এসব খাবার খাওয়া হলে দ্রুত পেট ভরে না। যে কারণে প্রয়োজনের থেকে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করা হয়। যা বর্তমান প্রজন্মের স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

এছাড়া, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের উচ্চ গ্লাইসেমিক লোড রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরে ইনসুলিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, নিয়মিত এই চক্র চলতে থাকলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে; যাকে ইনসুলিন রেসিস্টেন্স বলা হয়। এ কারণে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এখন টাইপ–২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। একইসঙ্গে খাবারে থাকা অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং ধমনিতে চর্বি জমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ শরীরের প্রদাহজনিত (inflammatory) প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয় এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে। এই পরিবর্তন শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অকারণে উদ্বেগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যাগুলো বেড়ে যাচ্ছে।

এছাড়া আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতেই পারে না, প্রতিদিনের খাবারের বড় অংশ অতিপ্রক্রিয়াজাত। প্যাকেট মোড়ানো অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ৩০টিরও বেশি স্বাস্থ্য-সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া এসব খাবার বেশি খাওয়ার সঙ্গে যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া মানুষের মৃত্যুঝুঁকি ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। এসব খাবারে ক্যালোরি বেশি হলেও আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান কম থাকে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, ওজন বাড়ে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ দেখা দেয়।

বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের মোট ক্যালোরির প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্যালোরি আসে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ কারণে ছোট-বড় সবার প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার আগে প্যাকেটের গায়ে থাকা পুষ্টি লেভেল পড়া উচিত।

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত দীর্ঘ উপাদান তালিকা থাকে, যেগুলোর অনেকটাই ঘরের রান্নায় ব্যবহৃত হয় না। উপাদানগুলো চিনতে না পারলে ধরে নেয়া যায় খাবারটি বেশি প্রক্রিয়াজাত। তবে মনে রাখা উচিত, সব ক্যালোরি এক নয়। যেমন- একটি আপেল থেকে পাওয়া ক্যালোরি আর আপেল ফ্লেভারযুক্ত বার থেকে পাওয়া ক্যালোরি এক নয়। সংখ্যায় সমান হলেও পুষ্টিমানে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

করণীয়:
সম্ভব হলে ঘরে রান্না করা খাবার গ্রহণ করুন। তাজা ফল, শাকসবজি ও সম্পূর্ণ শস্য বেছে নিন। কম উপাদানযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার নির্বাচন করুন। ধীরে ধীরে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমান।

এসব ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় স্বাস্হ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে। এ জন্য খাবারের প্যাকেট থেকে শুরু করে প্লেট পর্যন্ত সচেতন থাকা উচিত। একইসঙ্গে প্রাকৃতিক ও সতেজ খাবার রাখার অভ্যাস করতে হবে খাদ্যতালিকায়।

আরও পড়ুন