ইরানে ফের যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৩১, ২৫ আগস্ট ২০২৬

ইরানে ফের যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির

তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে করমর্দন করছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সোমবার ইরান সফরে যাচ্ছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সফরে তিনি ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

চলতি বছরে এটি আসিম মুনিরের তৃতীয় ইরান সফর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই তার এবারের সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সফরের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে তারা বিস্তারিত জানাননি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ (আইএসপিআর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আল-জাজিরার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। এবারওয়ান সফরের ঘোষণা ইসলামাবাদের পরিবর্তে তেহরান থেকে আসায় বিষয়টি কিছুটা ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই সফরের মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা আরও এগিয়ে যাবে। সফরকালে আসিম মুনির ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সফরের আগে গত চার দিনের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আসিম মুনিরের দুই দফা ফোনালাপ হয়েছে। বুধবার ও শনিবারের ওই ফোনালাপে পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

## চলতি বছরে তৃতীয় সফর

চলতি বছরের এপ্রিলে প্রথমবার তেহরান সফর করেন আসিম মুনির। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর ওই সফর হয়।

এরপর মে মাসে আবারও ইরান সফর করেন তিনি। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় ‘সামান্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

তবে এবার তার সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারককে ঘিরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

সফরে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। গত ৭ আগস্ট মক্কায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এ ছাড়া ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের কার্যক্রমও আলোচনায় আসতে পারে। ইরানের সঙ্গে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। গত ১১ আগস্ট বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলায় তিন পাকিস্তানি নাবিক নিহত ও কয়েকজন আহত হন।

সফরে আসিম মুনির ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের প্রধান মেজর জেনারেল আহমাদ ভাহিদি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহসেন রেজাই রয়েছেন।

## স্থগিত হয়ে গেছে ইসলামাবাদ সমঝোতা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের উদ্যোগ এমন এক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যখন ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। গত ১৭ জুন পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই সমঝোতা হয়েছিল। আগস্টের মাঝামাঝি এর মেয়াদ শেষ হলেও তা বাড়ানোর বিষয়ে কোনো পক্ষই সম্মত হয়নি।

এদিকে ইরান এখনও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে আগে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, বিদেশে থাকা ইরানের সম্পদ জব্দমুক্ত করতে হবে এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করতে হবে।

এর মধ্যেই সোমবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার কথা। মার্কিন কর্মকর্তারা এটিকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরান অবশ্য এ পরিকল্পনাকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসিম মুনিরের সফর থেকে বড় কোনো সমঝোতা না এলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামার চিমা বলেন, উভয় পক্ষই পাকিস্তানকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখে, যারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই আলোচনায় সহায়তা করছে। ফলে ইসলামাবাদ উভয় পক্ষকে সংকট থেকে বের হওয়ার একটি পথ দেখাতে পারে।

তবে লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা বিষয়ক অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আসিম মুনিরের ভূমিকা মূলত সামরিক পর্যায়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, আসিম মুনিরের সফর হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত করার পথও তৈরি করতে পারে। তবে এ সফর থেকে বড় কোনো ফলাফল আসবে কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
 

সূত্র: আল জাজিরা

আরও পড়ুন