রংপুরের চার খুনে জমি-জাতিগত বিরোধের ইঙ্গিত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯:১১, ২৭ আগস্ট ২০২৬

রংপুরের চার খুনে জমি-জাতিগত বিরোধের ইঙ্গিত

রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় মহানগর পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন পুলিশ কমিশনার ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির তথ্য যাচাই করে দেখছে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা এবং ডোপ টেস্টের জন্য আদালতে আবেদন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণগুলোও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দিতে পূর্বপুরুষদের জমি বিক্রির বিষয়টি উঠে এসেছে। গণপতি চক্রবর্তী যে জমিতে বাড়ি নির্মাণ করেছেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটি তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হলেও পরিবারের সব শরিক তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি—এমন একটি বিষয়ও তদন্তে সামনে এসেছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল কি না, তা যাচাই করছে পুলিশ।

এ ছাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকায় দাস সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাধিক্য এবং গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের ব্রাহ্মণ পরিচয়ের কারণে সামাজিক দূরত্ব বা কোনো ধরনের বিরূপতা তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।

তিনি বলেন, এলাকাটির মানুষের সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের যোগাযোগ থাকলেও নিয়মিত পারিবারিকভাবে যাতায়াত ছিল না। এই সামাজিক ব্যবধান হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান তিনি। এর আগে রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে মাছুয়াপাড়া, যা স্থানীয়ভাবে দাসপাড়া নামেও পরিচিত, সেখানে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। ২০১০ সালে জমিটি কেনা হলেও কয়েক বছর পর সেখানে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়।

প্রায় তিন বছর ধরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করছিলেন গণপতি। ভবনের নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন।

শনিবার রাতে বাড়িটি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আগামী চক্রবর্তী স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করছিলেন, আর প্রীয়ম ছিল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ঘটনার পরদিন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

এরপর রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই রাতেই তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

মঙ্গলবার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের রাতে তিন বন্ধু একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।

মামলাটির তদন্ত পরে কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই আসামির জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবন, বাড়ির ছাদে অবস্থান এবং গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার পর পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। তবে জবানবন্দিতে দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে তবেই তদন্তের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের সঙ্গে আসামিদের জবানবন্দির তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহের ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কারও কাছে অতিরিক্ত কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানালে সেগুলোও যাচাই করে দেখা হবে। 

আরও পড়ুন