ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের ভিত্তি আছে: জাতিসংঘ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২:২৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের ভিত্তি আছে: জাতিসংঘ

ফেব্রুয়ারির মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১২০ শিশুসহ অন্তত ১৫৬ জন নিহত-ছবি/ বিবিসি

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরানে চালানো দুটি হামলায় অন্তত ১৭৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল নির্বিচার হামলা। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে লামের্দে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছিল এবং মিনাবে কী ঘটেছিল, তা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য-উপাত্তকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

তারা বলেছেন, দেশটির ৩১টি প্রদেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ‘নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর মাত্রায়’ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

ইরান এখনো এসব অনুসন্ধান নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পদ্ধতিগত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

‘তাদের অপরাধ কী ছিল?’: যে ইরানি স্কুলে হামলায় ১২০ শিশু নিহত, সেখানে বিবিসি
লামের্দে প্রাণঘাতী ইরানি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন
ইরানের শহরে প্রাণঘাতী হামলায় ব্যবহৃত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের ভিডিও পাওয়ার দাবি বিশেষজ্ঞদের
ইরানি স্কুলের কাছে সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, ভিডিও বিশ্লেষণে দাবি

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তথ্য-অনুসন্ধান মিশন সতর্ক করে বলেছে, ‘ইরানের বেসামরিক মানুষ নিজেদের সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশের প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যে আটকা পড়েছে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে জমা দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনের জন্য মিশনের তিন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সংঘাত চলাকালে বেসামরিক মানুষের ওপর চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুটি হামলার তদন্ত করেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার দিন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জন শিশু।

তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওই স্কুলটি সেদিন হামলার শিকার হওয়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একটি নৌ-কমপ্লেক্সের পাশে ছিল। তবে স্কুলটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যসহ সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে—যার মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক তদন্তে মার্কিন বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে—এবং সংঘাতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মালিক একমাত্র পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায়, স্কুলটিতে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র চালিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

তারা আরও বলেন, স্কুলটিই ছিল হামলার ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লক্ষ্য’ এবং আইআরজিসি কমপ্লেক্সে হামলার সময় ভুলবশত আঘাত বা পার্শ্ববর্তী ক্ষয়ক্ষতির কারণে স্কুলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যও তারা উল্লেখ করেন, যারা বলেছেন স্কুলটিতে দুইবার হামলা চালানো হয়েছিল।

মিনাবের হামলা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, তারা ‘কখনোই বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করবে না।’

একই দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকার ওপর প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিএসআরএম) থেকে টাংস্টেনের গোলা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ২১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে সাতজন শিশু।

এ ক্ষেত্রেও তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্রীড়া কমপ্লেক্সটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলা চালিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। এর পক্ষে তারা যে প্রমাণ তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে রয়েছে—সংঘাতে পিএসআরএম ক্ষেপণাস্ত্রের মালিক একমাত্র পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, ওই দিন লামের্দে তারা কোনো হামলা চালায়নি। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র পিএসআরএম ছিল—এমন প্রতিবেদনও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।

দুটি ঘটনাতেই তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হওয়া কিংবা বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো নির্বিচার হামলা চালানোর যুদ্ধাপরাধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র’—এমনটা বিশ্বাস করার মতো ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ রয়েছে।

ছবির ক্যাপশন: লামের্দের ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলায় আহত ইরানি কিশোরী আনিতা ঘাসেমি শরীরে থাকা ক্ষত দেখাচ্ছেন। তার পেছনের দেয়ালে ক্ষেপণাস্ত্রের ছররার আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। লামের্দ, ইরান; ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

আনিতা ঘাসেমি লামের্দের ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলায় আহত হন।

তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষের সহিংস দমন-পীড়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতীতের দমন-পীড়নের তুলনায় এটি ছিল নজিরবিহীন মাত্রার বিস্তার। এতে ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করা হয় এবং ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তারা প্রত্যক্ষদর্শী, স্বাস্থ্যকর্মী ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ভবনের ছাদ ও অন্যান্য উঁচু জায়গায় অবস্থান নিয়ে জনতার ওপর অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে গুলি চালান।

বিক্ষোভকারীদের মাথা, বুক ও চোখে ধাতব শটগানের গুলির আঘাতে গুরুতর জখম হয় এবং অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান।

দমন-পীড়ন বাড়তে থাকলে নিরাপত্তা বাহিনী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালায়, আহত বিক্ষোভকারীদের মারধর ও গ্রেপ্তার করে এবং কিছু স্বাস্থ্যকর্মীকেও আটক করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা নিতে যেতে অনেক ভুক্তভোগী নিরুৎসাহিত হন।

তারা আরও বলেন, বিক্ষোভের সময় আটক হওয়া কয়েক হাজার মানুষ নির্যাতন, একাকী বন্দিত্ব এবং আইনজীবীর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শিকার হন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এরপর সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার আরও বাড়িয়েছে। বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে দ্রুত বিচার শেষে অন্তত ২৯ জন পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা ৩ হাজারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি—এমনটা বিশ্বাস করার মতো শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। সরকার নিহতদের বেশিরভাগকেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকারকর্মীদের সংবাদ সংস্থা (হ্রানা) জানিয়েছে, তারা ৭ হাজারের বেশি মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে, যাদের প্রায় সবাই বিক্ষোভকারী।

তথ্য-অনুসন্ধান মিশনের বিশেষজ্ঞরা উপসংহারে বলেন, দমন-পীড়নের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘অনেক গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’ করেছে। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলার অংশ হিসেবে সংঘটিত ‘হত্যা, কারাবন্দিত্ব ও অন্যান্য গুরুতরভাবে শারীরিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর পর্যায়ে পড়ে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই অস্থিরতা উসকে দিয়েছে। তারা এসব মৃত্যুর জন্য ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করেছে। 

সূত্র: বিবিসি

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন