আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১:১৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কায়রোতে বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি।-ছবি: আল জাজিরা
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সাম্প্রতিক বৈঠক এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশই নতুন করে উদ্বিগ্ন। বৈঠকের কয়েক দিন আগে ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
এরপর ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান অভিযান এবং সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হুতিদের একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব এখন নিজেদের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় সহযোগিতা খুঁজছে। একই কারণে মিসরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কারণ, লোহিত সাগরের এই নৌপথের সঙ্গে মিসরের সুয়েজ খালের রাজস্ব সরাসরি সম্পর্কিত।
মিসরের সিনেটের সদস্য আবদেল মোনেম সাইদ বলেন, সৌদি যুবরাজের সফরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও সামরিক—সব ধরনের মাত্রা রয়েছে। তার মতে, হুতিদের অগ্রযাত্রা মিসরের অর্থনীতি ও সুয়েজ খালের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করেছে।
তিনি সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যে যৌথ কৌশলগত ও সামরিক চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইরাক থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, কায়রো এখন সুয়েজ খাল থেকে বাব আল-মান্দাব পর্যন্ত এলাকাকে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে দেখছে। দক্ষিণের এই প্রবেশপথ অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়লে মিসর জাহাজ চলাচল, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কৌশলগত প্রভাব—তিন ক্ষেত্রেই ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তবে দুই দেশের বৈঠকের পর নির্দিষ্ট কোনো সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় জোট
মিসর ইতোমধ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটের অংশ। আগস্টে গঠিত এই জোটের লক্ষ্য লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে হুতিরা বাব আল-মান্দাব বন্ধ করে দিতে পারে, একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
জোটটির প্রতিষ্ঠা নথিতে এটিকে প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জোটটি হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। একইভাবে, সাম্প্রতিক অগ্রগতির পরও হুতিরা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ক্রিগের মতে, সৌদি-মিসর সামরিক সহযোগিতার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নজরদারি, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগর ঘিরে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয় থাকতে পারে।
তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে মিসরের সরাসরি সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে সীমা থাকবে বলেও তিনি মনে করেন। তার মতে, মিসর সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করতে চাইবে, কিন্তু ইয়েমেনের পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায় নিতে চাইবে না।
এর পেছনে মিসরের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও ভূমিকা রাখতে পারে। ১৯৬০-এর দশকে মিসরের তৎকালীন নেতা গামাল আবদেল নাসের উত্তর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সেই অভিযানে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি হয়েছিল এবং প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে বৃহত্তর সমন্বয়
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি অপ্রত্যাশিত নয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বেশ কিছু মিল দেখা গেছে।
জানুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি কায়রোতে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর মিসরের প্রেসিডেন্সি জানিয়েছিল, আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে মিল রয়েছে এবং রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকেও সুদানসহ বিভিন্ন দেশের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দেওয়া হয়। মিসরের স্টেট ইনফরমেশন সার্ভিস জানিয়েছে, সুদানের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার যেকোনো হুমকি মিসর, সৌদি আরব এবং পুরো অঞ্চলের সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
ক্রিগের মতে, দুই দেশই রাষ্ট্রগুলোর বিভাজন, মিলিশিয়া, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং বাইরের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। সুদান, লিবিয়া, সোমালিয়া এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইয়েমেনেও এই বিষয়টি দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সৌদি-ইউএই সম্পর্কের জটিলতা
তবে সৌদি আরবের সঙ্গে মিসরের ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কায়রোর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতিগত পার্থক্য রয়েছে।
মিসরের অর্থনীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত বড় বিনিয়োগকারী। ২০২৫ সালে দেশটিতে আমিরাতের নিট বিনিয়োগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি।
ক্রিগের মতে, এ কারণে মিসরের জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়া কঠিন। তার ধারণা, কায়রো নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রিয়াদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ালেও আবুধাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
ইয়েমেন নিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর
যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও সৌদি আরব বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটি তুরস্ককে দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এনেছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন কাঠামো তৈরি করেছে।
এ ছাড়া লোহিত সাগরের জন্য বহুপক্ষীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোট গঠন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস এবং ইউক্রেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে সৌদি আরব।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের হামলা ঠেকাতে পারেনি। একইভাবে ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সৌদি-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকেও এগুলো কার্যকরভাবে সক্ষম করেনি।
সৌদি-মিসর বৈঠকে তাই ইয়েমেনের জন্য সামরিক সমাধানের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে। মিসর ইয়েমেন সংকটের একটি ‘সমন্বিত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে’ পৌঁছানোর প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উদ্যোগগুলো যুদ্ধ চলাকালীন তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে কী ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠবে, তারও ইঙ্গিত দিতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং