আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২:১৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গন্ডারিন গসপেলের অলংকৃত পৃষ্ঠাগুলো।-ছবি: আল জাজিরা
ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে লুট হওয়া ইথিওপিয়ার একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ প্রায় ১৬০ বছর পর একটি বেসরকারি বিক্রয় তালিকায় পুনরায় সামনে আসায় এর মালিকানা নিয়ে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে।
‘গন্ডারিন গসপেল’ নামের প্রাচীন বাইবেলটি মূলত ইথিওপিয়ার সম্রাট তেওড্রোস দ্বিতীয়ের মালিকানায় ছিল। আবুধাবি আন্তর্জাতিক বইমেলায় বিক্রির জন্য রাখা দুর্লভ বইয়ের তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বইটির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে ধর্মগ্রন্থটি বিক্রির তালিকা থেকে সরিয়ে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা এ দাবির পক্ষে ‘নৈতিক ও মানবিক’ কারণের কথা বলেছে।
ঘটনাটি ইথিওপিয়া থেকে লুট হওয়া প্রত্নসম্পদ বৃহৎ পরিসরে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিকে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা জাদুঘর ও সংগ্রাহকদের কাছে থাকা আফ্রিকার বিপুলসংখ্যক চুরি হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কও নতুন করে শুরু হয়েছে।
ইথিওপিয়ান হেরিটেজ অথরিটির (ইএইচএ) প্রধান আবেবাও আয়ালেউ ভিয়েনাভিত্তিক দুর্লভ বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইনলিব্রিসকে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘যেসব শিল্পবস্তু লুট করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত, সেগুলো বিক্রি এড়িয়ে চলার স্পষ্ট নৈতিক কারণ রয়েছে।’
আল জাজিরার দেখা ওই চিঠিতে তিনি আরও বলেন, ‘লুট হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন সামগ্রী বিক্রির সঙ্গে ইনলিব্রিসের মতো বিখ্যাত শিল্পবিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের যুক্ত হওয়া নৈতিকভাবে অনুচিত এবং প্রতিষ্ঠানের সুনামের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।’
তবে ইএইচএর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ইনলিব্রিস। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ধর্মগ্রন্থটি ফেরত দেওয়ার কোনো ‘আইনি ভিত্তি নেই’। তাদের যুক্তি, ১৮ শতকের আগে সংঘাতের সময় সাংস্কৃতিক সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে কোনো আইন ছিল না। ফলে বর্তমান মালিকের এটি হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা নেই।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনলিব্রিসের প্রধান হুগো ওয়ার্টশের্ক সংগ্রাহকের নাম প্রকাশ করেননি। তবে তিনি বলেন, ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে বইটি হস্তান্তর করা বেআইনি হবে।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি চাই এসব পাণ্ডুলিপি তাদের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু আমি আইন তৈরি করি না। আমি শুধু একজন ব্যবসায়ী।’
আবুধাবি বইমেলায় বাইবেলটি বিক্রির চেষ্টা করার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন ওয়ার্টশের্ক। তার দাবি, এটি শুধু প্রদর্শনীর একটি উপকরণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের হারানো সম্পদ
চকচকে চামড়ায় বাঁধানো এবং জটিল সোনালি নকশায় সজ্জিত গন্ডারিন গসপেলটি সম্রাট তেওড্রোসের গ্রন্থাগার থেকে চুরি হয়েছিল।
প্রাচীন দক্ষিণ সেমিটিক ভাষা গি’জে লেখা এই পাণ্ডুলিপিতে ২৩৫টি চিত্র রয়েছে। এতে উজ্জ্বল লাল, সবুজ ও হলুদ রঙে লুক ও জনের গসপেলের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৭৩০ থেকে ১৭৩৪ সালের মধ্যে গন্ডার শহরে এটি তৈরি করা হয়েছিল।
ইথিওপিয়ার আক্সুম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প ইতিহাসের অধ্যাপক আব্রেহা কিরোস বলেন, এটি শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় গ্রন্থ নয় এবং সম্রাট তেওড্রোসের সঙ্গে এর সম্পর্কের মধ্যেই এর গুরুত্ব সীমাবদ্ধ নয়।
তার মতে, ইথিওপিয়ার পাণ্ডুলিপি সংস্কৃতি, প্রাচীন গি’জ সাহিত্য এবং একসময় শিল্প ও স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত গন্ডারের শৈল্পিক ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘এটি ইথিওপিয়ার ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক সময়ের সঙ্গেও যুক্ত। স্পষ্ট কোনো আইনি ব্যবস্থা না থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে আলোচনা বা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই।’
সম্রাট তেওড্রোস ১৮৫৫ সাল থেকে ১৮৬৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইথিওপিয়া শাসন করেন। মাগদালার যুদ্ধে তিনি নিহত হন। বিভিন্ন অভিযানে তিনি বিপুলসংখ্যক মূল্যবান সম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন। এগুলো নিয়ে তিনি একটি বিশাল রাজকীয় গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন, যেটিকে কিছু ইতিহাসবিদ ইথিওপিয়ার প্রথম আধুনিক জাদুঘর বলে উল্লেখ করেন।
১৮৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী স্থানীয় শাসকদের কারণে তার সাম্রাজ্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ে। এ সময় তেওড্রোস ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে সহায়তা চান। খ্রিস্টান শক্তি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ব্রিটেনের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখেছিলেন।
রানি ভিক্টোরিয়া তার চিঠির জবাব না দেওয়ায় তেওড্রোস ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বন্দি করেন। এর পর ব্রিটেন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
১৮৬৮ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঠানো ১৩ হাজার সেনা মাগদালায় তেওড্রোসের রাজদরবারে হামলা চালায় এবং তার ৪ হাজার সেনাকে হত্যা করে। আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তেওড্রোস আত্মহত্যা করেন।
ব্রিটিশ সেনারা মাগদালা লুট করে। মূল্যবান প্রত্নসম্পদ থেকে শুরু করে তেওড্রোসের চুলের গোছা পর্যন্ত তারা নিয়ে যায়। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ব্রিটিশ কমান্ডার রবার্ট নেপিয়ার গন্ডারিন গসপেলটি নিয়ে যান। পরে এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা ও ব্রিটিশ জাদুঘরগুলোর হাত ঘুরে প্রায় এক দশক আগে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।
ফিরবে কি ফিরবে না?
মাগদালা ও ইথিওপিয়ার অন্যান্য সময়ের হাজার হাজার লুট হওয়া প্রত্নসম্পদ এখনো দেশের বাইরে রয়েছে। তবে ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষ সেগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পশ্চিমা জাদুঘরে থাকা লুট হওয়া সামগ্রী ফেরত দেওয়ার দাবিতে কর্মী ও আফ্রিকার বিভিন্ন সরকারের ব্যাপক আহ্বানের মধ্যে ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামসহ কয়েকটি দেশ স্থায়ীভাবে কিছু সম্পদ ফেরত দেওয়া অথবা সাময়িকভাবে ‘ঋণ’ দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছে।
মে মাসে ব্রিটেন সম্রাট তেওড্রোসের বলে ধারণা করা একটি চুলের গোছা এবং তার রক্তে দাগযুক্ত বলে ধারণা করা এক টুকরো কাপড় ইথিওপিয়াকে ফেরত দেয়।
তবে গন্ডারিন গসপেলও ইথিওপিয়ায় ফিরবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইনলিব্রিসের ওয়ার্টশের্ক আল জাজিরাকে বলেন, ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের ভাষা ‘হুমকিমূলক’ ছিল। তবে তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠান আলোচনায় বসতে প্রস্তুত এবং ‘বিশেষ মূল্যে’ সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজি। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত পাণ্ডুলিপিটির আইনগত মালিকের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গুরুতর ক্রয়ের প্রস্তাব এলে তা বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তবে প্রত্নসম্পদটি ফেরত দেওয়ার দায় রয়েছে—এমন ভিত্তিতে আমরা আলোচনা করব না।’
তবে প্রথম এই প্রদর্শনীর বিষয়টি ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষকে জানানো ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আলুলা প্যাঙ্কহার্স্ট এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ইথিওপিয়ান হেরিটেজ অথরিটি তাদের একটি ভদ্র চিঠি লিখেছিল, যা কোনোভাবেই হুমকি ছিল না।’
প্যাঙ্কহার্স্ট বলেন, ইথিওপিয়ার কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো—পাণ্ডুলিপিটি স্পষ্টতই লুট করা হয়েছিল, যা ইনলিব্রিসও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। তাই প্রথমে এটি বিক্রি থেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত এবং এরপর আলোচনা হতে পারে।
তার মতে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি নিলাম বাতিলের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। বিক্রেতারা লুট হওয়া সামগ্রী প্রকাশ্য বাজারে বিক্রি না করার নীতি মেনে নিয়েছেন এবং পরে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে।
আক্সুম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিরোস বলেন, সমাধান অবশ্যই সংঘাতপূর্ণ হতে হবে এমন নয়। আলোচনার মাধ্যমে ফেরত দেওয়া, দান করা, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া, যৌথ তত্ত্বাবধান অথবা উভয় পক্ষের সম্মত অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে দেশ ও জনগোষ্ঠী থেকে সাংস্কৃতিক সম্পদটি এসেছে, সেটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।’
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং