নেপালের বন্যায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এতটা নীরব কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২:২৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালের বন্যায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এতটা নীরব কেন?

নেপালের নুয়াকোট জেলার দেবীঘাটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর কাদায় ঢেকে থাকা বাড়িঘর; ড্রোনে ধারণ করা ছবি।-ছবি: আল জাজিরা

নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দুর্যোগে ১ হাজার ৩৮০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ১০০ জন। এই বিপর্যয়ে হাজার হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

নেপাল সরকারের দ্রুত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পুরোপুরি পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে ৪৭০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থ নেপালের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ এবং দেশটির কেন্দ্রীয় বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।

তবু ব্যাপক গণমাধ্যম প্রচার ও জনসাধারণের মনোযোগের পরও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত রয়ে গেছে।

বিদেশি সরকারগুলোর পক্ষ থেকে কিছু শোকবার্তা, জরুরি ত্রাণসামগ্রী এবং সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগ মূলত তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র ৩৬ লাখ ডলার, যুক্তরাজ্য ৬০ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই সামান্য অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে এবং শীতকাল পার করার জন্য তাদের আশ্রয়, খাবার ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়।

প্রতিক্রিয়া এতটা অপর্যাপ্ত কেন? এই দুর্যোগের ভয়াবহতার তুলনায় যে জরুরি মাত্রায় রাজনৈতিক নেতাদের কথা বলা প্রয়োজন ছিল, তা এত কম কেন?

এর একটি কারণ হয়তো এমন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে, যা নেপাল এখন সরাসরি সামনে এনেছে: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির মূল্য কে দেবে?

নেপাল ক্রমবর্ধমানভাবে এই বন্যাকে শুধু আবহাওয়াজনিত আরেকটি দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং এমন একটি জলবায়ু সংকটের পরিণতি হিসেবে তুলে ধরছে, যার জন্য দেশটির অবদান প্রায় নেই বললেই চলে।

এটি জলবায়ু সংকটের আরও গভীর একটি বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধনী দেশগুলো কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সক্ষমতার তুলনামূলকভাবে অনেক বড় অংশ ব্যবহার করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে তারা নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে নেপালের মতো দেশগুলো সেই বায়ুমণ্ডলীয় সক্ষমতার কাছাকাছি সমপরিমাণ অংশ ব্যবহার করার সুযোগও খুব কম পেয়েছে।

ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে যারা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছে এবং যারা এর ক্রমবর্ধমান পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে—তাদের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

নেপালের বক্তব্য হলো, জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কোনো দয়া বা দান নয়। এটি জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়। দেশটি জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা তহবিলের কাছে জরুরি সহায়তা চেয়েছে। কীভাবে এর জবাব দেওয়া হবে, তা এখন তহবিলটির বোর্ড বিবেচনা করছে।

এটি রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ বদলে দেয়। আর এর মাধ্যমে এক দশক আগে প্যারিসে হওয়া সমঝোতার বিষয়টি আবার সামনে আসে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের আওতায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু ব্যবস্থায় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’—অর্থাৎ এমন ক্ষয়ক্ষতি, যা প্রশমন বা অভিযোজনের মাধ্যমে পুরোপুরি ঠেকানো যায় না—স্বীকার করার জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছে। প্যারিস চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে তারা এর স্বীকৃতি নিশ্চিত করে।

তবে ধনী দেশগুলো এই স্বীকৃতির অর্থ কী হবে, তার একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়। প্যারিস চুক্তির সঙ্গে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভাষায় বলা হয়, ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ‘কোনো দায় বা ক্ষতিপূরণের ভিত্তি তৈরি করে না বা এর সঙ্গে যুক্ত নয়’।

এটি ছিল একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক সমঝোতা: বিশ্ব জলবায়ু-সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতিকে স্বীকার করতে পারবে, কিন্তু সেই স্বীকৃতি ক্ষতিপূরণের দাবি তোলার দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।

নেপাল এখন সেই সমঝোতার সীমা পরীক্ষা করছে।

আইনি পরিস্থিতি শুধু এই কথা বলার চেয়ে আরও জটিল যে প্যারিস চুক্তি জলবায়ু ক্ষতিপূরণ নিষিদ্ধ করেছে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দেয়, জলবায়ু ব্যবস্থা রক্ষায় দেশগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো দেশ সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, তাদের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার দেওয়ার দায় থাকতে পারে। এই রায় আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।

নেপালসহ জলবায়ু সংকটে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি মোকাবিলার দায়িত্ব স্বীকার করার আগে কোনো নির্দিষ্ট দেশের কারণে একটি নির্দিষ্ট বন্যা ঘটেছে—এমন প্রমাণ দেশটির দেখানো জরুরি নয়।

তবে আরেকটি সমস্যা রয়েছে: উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও সংকুচিত হচ্ছে। ঠিক এমন সময়ে যখন জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা কমছে। ২০২৫ সালে এই সহায়তা ২৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে, যা রেকর্ডে এক বছরে সবচেয়ে বড় পতন। মানবিক সহায়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সমস্যাটি শুধু এই নয় যে সহায়তার পরিমাণ খুব কম।

কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি গ্লোবাল নর্থ ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যে অসম অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও অর্থ একদিকে স্থানান্তর করেছে। জলবায়ু অর্থায়ন এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে পারবে না, যদি সেই সম্পদের সামান্য একটি অংশ শুধু ঋণ বা বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়।

যে জলবায়ু বিপর্যয় তৈরিতে কোনো দেশের ভূমিকা সামান্য, সেই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে ঋণ করতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়।

আবার ক্ষতিপূরণও জলবায়ু প্রশমনের বিকল্প হতে পারে না। ধনী দেশগুলো বিশ্বের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনামূলকভাবে বড় অংশ ব্যবহার করে যেতে পারে না এবং একই সঙ্গে অন্যত্র এর পরিণতি উপেক্ষা করতে পারে না। তাদের নিজেদের নিঃসরণ ও পরিবেশগত অতিভোগ দ্রুত কমাতে হবে।

তাই নেপালের বন্যায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার এই নীরবতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে।

সম্ভবত বিশ্ব জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান মূল্য স্বীকার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যখন প্রশ্ন তোলে—এই সংকট তৈরিতে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে, খরচের বোঝা কি তাদেরই বহন করা উচিত—তখন বিষয়টি অনেক বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের পথ ইতোমধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’, জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনা এবং জলবায়ু বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে বিকশিত আন্তর্জাতিক আইন।

যা অনুপস্থিত, তা হলো রাজনৈতিকভাবে এই স্বীকৃতি যে জলবায়ু ধ্বংসের খরচ অনির্দিষ্টকাল ধরে অন্য কারও সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

জলবায়ু ন্যায়বিচারের যদি কোনো অর্থ থাকে, তাহলে এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত এমন ক্ষতির জন্য প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা বায়ুমণ্ডলীয় সম্পদের অসম ব্যবহারের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। 

সূত্র: আল জাজিরা

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন