আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩:০৯, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।-ছবি: আল জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে ক্রমবর্ধমান বিঘ্নের মধ্যে চীনে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়া ঠেকানোর মধ্যে ক্রমেই কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে বেইজিংকে।
চীন ও অন্যান্য এশীয় বাজারে তেল পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হয়ে ওঠা পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে তেল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আরব উপদ্বীপের মধ্য দিয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিবহনকারী ওই পাইপলাইনটি ইরান-সমর্থিত ইরাকের একটি গোষ্ঠীর হামলার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং বৃহত্তর অঞ্চলের সংঘাতের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে তেল সরবরাহের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথই ব্যাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বিধিনিষেধের কারণে রাশিয়া ও ইরানের অপরিশোধিত তেল পাওয়াও জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে চীনা শোধনাগারগুলোকে তেলের সরবরাহের জন্য আরও দূরের বাজারে খুঁজতে হচ্ছে। সহজলভ্য তেলের চালান পাওয়ার এই প্রতিযোগিতা চীনসহ বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প সরবরাহের জন্য চীনকে ক্রমেই বেশি প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, যা তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল সরবরাহ পুনরায় চালু করা—যেটি ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে—চীনের জন্য জরুরি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আগে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে বুধবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে বৈঠক হয়।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি বিশ্লেষক মার্ক আইয়ুব আল জাজিরাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তা চীনের জন্য ভালো নয়। চীন একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে।’ তার ভাষায়, শোধনাগারগুলো এখন ক্রমেই ‘হরমুজের বাইরে থাকা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বাজারে তেল খুঁজছে’।
প্রথম দফার তেল সংকট সামাল দিতে চীন সহায়তা করেছিল
যুদ্ধ শুরুর আগে চীন প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করত এবং দেশের ভেতরে আরও ৪৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন করত বলে রয়টার্স জানিয়েছে। নিজেদের শোধনাগারের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছিল দেশটি। ফলে বেইজিং অতিরিক্ত তেলের কিছু অংশ বিশাল মজুতে জমা করতে সক্ষম হয়েছিল, যা গত বছরের শেষ নাগাদ আনুমানিক ১৪০ কোটি ব্যারেলে পৌঁছেছিল।
এটি বৈশ্বিক তেলবাজারে সংকটের প্রভাব কিছুটা কমাতে সহায়তা করেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হিসেবে চীন যখন কম তেল কেনে, তখন বৈশ্বিক সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার ঠিক সময়ে চাহিদা কমে যায়।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র শুরু করা এই সংঘাত যেন বৈশ্বিক মন্দার দিকে না যায়, তা চীনের স্বার্থেই।’
তিনি বলেন, ‘তবে [চীনের কম তেল আমদানি] ইরানকে দুর্বল করা বা আমেরিকানদের সহায়তা করার জন্য করা হয়নি। চীন নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করছে। আর তাদের স্বার্থ হলো, বিশ্বের বাকি অংশ যেন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ তা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব চীনের ওপরও পড়বে।’
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক গড়ে মাত্র ৮১ লাখ ব্যারেল ছিল। বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এটি প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল বা ৩২ শতাংশ কম।
তবে এখন সেই মজুতের সুরক্ষা ক্ষয় হচ্ছে। আইয়ুব বলেন, এই পরিবর্তনের পেছনে আংশিকভাবে রয়েছে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করার বেইজিংয়ের সিদ্ধান্ত, যা যুদ্ধের শুরুর দিকে শোধনাগারের কার্যক্রম কম রাখতে সহায়তা করেছিল।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীন শোধনাগারগুলো আবারও অন্য জায়গা থেকে আমদানির সুযোগ খুঁজতে শুরু করেছে।’
শোধনাগারগুলো বেশি অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করছে এবং মজুত থেকে তেল কমে যাচ্ছে। ফলে চীনকে আবারও বাজারে গিয়ে বেশি তেল কিনতে হচ্ছে।
আইয়ুব বলেন, ‘প্রথমত, তারা শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়াতে চায়। দ্বিতীয়ত, তারা তাদের মজুত আবার গড়ে তুলতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘তাই চীন বাজার থেকে যতটা সম্ভব সরবরাহ পাওয়ার চেষ্টা করছে।’
চীন কোথা থেকে তেল পেতে পারে?
রাশিয়া ইতোমধ্যে চীনের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী। মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি ব্যাহত করা সামুদ্রিক সংকটপূর্ণ পথগুলো এড়িয়ে রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ তেল চীনে পৌঁছায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করেছে রাশিয়া।
রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে পাঠানো ESPO অপরিশোধিত তেল এক সপ্তাহেরও কম সময়ে চীনের বন্দরে পৌঁছাতে পারে। পাইপলাইনের মাধ্যমেও স্থলপথে তেল যায়। ফলে চীনা শোধনাগারগুলো রাশিয়ার সহজলভ্য তেলের চালান সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ESPO চালান অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে কিনে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এসব কেনাকাটাকে জটিল করেছে, তবে বন্ধ করতে পারেনি। Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়া থেকে চীনের সমুদ্রপথে তেল আমদানি দৈনিক ১৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা জুলাইয়ের ১৪ লাখ ব্যারেলের চেয়ে বেশি এবং মার্চের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে চীন প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পায়।
যুদ্ধের আগে ইরানও চীনকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সস্তা তেলের একটি বড় উৎস সরবরাহ করত। গত বছর চীন আনুমানিক প্রতিদিন ১৪ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছিল। কিন্তু সংঘাত এবং ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার কারণে সেই সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
চীন লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার উৎপাদক দেশগুলোর দিকেও তাকাতে পারে। গত বছর ব্রাজিল ইতোমধ্যে চীনের শীর্ষ পাঁচ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারীর মধ্যে ছিল এবং ২০২৬ সালের মার্চে দেশটি চীনকে দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে। এছাড়া ভেনেজুয়েলা, অ্যাঙ্গোলা ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে চীনা শোধনাগারগুলোতে তেল সরবরাহ করে আসছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের হারানো সরবরাহ এসব দেশ কতটা সহজে পূরণ করতে পারবে, তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি একে অপরের বিকল্প নয়। চীনের শোধনাগারগুলো বিভিন্ন ধরনের তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য আলাদাভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং তেলের ঘনত্বেও পার্থক্য রয়েছে। যেমন, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল সাধারণত রাশিয়ার ESPO তেলের তুলনায় অনেক বেশি ভারী, যে তেল সংগ্রহে চীনা শোধনাগারগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে।
দূরত্বও আরেকটি বাধা। রাশিয়ার ESPO তেল এক সপ্তাহেরও কম সময়ে চীনে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে ব্রাজিল, পশ্চিম আফ্রিকা বা আমেরিকার অন্য অঞ্চল থেকে আটলান্টিক পেরিয়ে তেল আনতে বেশি সময় লাগে এবং পরিবহন খরচও বেশি। পাশাপাশি বিকল্প উৎপাদকদের বিক্রির জন্য থাকা তেলের পরিমাণও সীমিত।
Kpler-এর হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত রুশ ও ইরানি তেল চীনের সরবরাহ ঘাটতির কেবল আংশিক অংশ পূরণ করতে পারবে।
এদিকে সৌদি আরবও চীনকে তেল সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। আগস্টে সৌদি আরামকো চীনের কাছে অন্তত ৪০ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করেছে। তবে আগস্টের দিনগুলোর হিসাবে গড় করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় দৈনিক মাত্র প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ব্যারেল।
চীন আসলে কতটা ঝুঁকিতে?
চীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দেশটির উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ এবং শোধনাগারগুলোতে প্রক্রিয়াজাত তেলের পরিমাণের মধ্যে বিশাল ব্যবধান।
রয়টার্সের উদ্ধৃত চীনা তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে চীন প্রতিদিন প্রায় ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করেছে। অন্যদিকে শোধনাগারগুলোতে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে দৈনিক ১ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল। ফলে দৈনিক প্রায় ৯৬ লাখ ব্যারেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা আমদানি অথবা মজুত থেকে পূরণ করতে হয়েছে।
তবে অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় চীনের তেলের ব্যবহার কমানোর সক্ষমতা বেশি। বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত সম্প্রসারণ পেট্রলের চাহিদা কমিয়েছে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও বিদ্যুতায়নের ফলে তেলের ব্যবহার কমেছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদনও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
তবে এরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিমান চলাচল, ভারী পরিবহন এবং চীনের বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এখনো তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই চীন শোধনাগারের উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রাথমিক ধাক্কা থেকে দেশটিকে সুরক্ষা দেওয়া মজুত পুনরায় পূরণ করার চেষ্টা করলেও সীমিত সরবরাহের জন্য তাকে অন্য ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এতে তেলের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
আইয়ুব বলেন, ‘বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে তারা বাজারে যে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, তার সবটাই পাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে চাপ বাড়বে এবং দাম আরও বাড়বে।’
চীনের তেল সরবরাহের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কূটনৈতিকভাবেও বেইজিংয়ের জন্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বুধবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফিরতে আহ্বান জানান এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে সব পক্ষকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের এক সপ্তাহ আগে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, দুই নেতা ইরান এবং তেহরানের সঙ্গে চীনের আর্থিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখবেন।
বেইজিং ওয়াশিংটনকে আলোচনায় ফিরতে এবং জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট বিঘ্ন অবসান ও বৈশ্বিক তেলবাজার স্থিতিশীল করতে সহায়তা করার আহ্বান জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং