নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:০২, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ করছেন এক শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের পর বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যক্তির ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ না করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ওয়েবসাইট চালুর বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে এসেছে।
সংস্কারকাজ শেষে রোববার ডাকসু সংগ্রহশালার উদ্বোধন করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য কোনো ছবি না থাকলেও জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এর একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া জিন্নাহর ভাষণের সময়ের ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সোমবার ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তির ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে প্রশাসন ও ডাকসু নেতাদের জবাবদিহি দাবি করেন।
এর আগে ছাত্রদলও জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়। সংগঠনটি ডাকসুর সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মকাণ্ডকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে অভিযোগ করে।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদের পাঠানো বিবৃতিতে প্রশাসনের অবস্থান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ডাকসু-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক কয়েকটি কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রশাসন জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কথা।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২ সেপ্টেম্বর কলাভবন সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের অনুমোদন কিংবা আলোচনার মাধ্যমে করা হয়নি। ফলে এ উদ্যোগকে এখতিয়ারবহির্ভূত হিসেবে দেখছে প্রশাসন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য চালু করা ওয়েবসাইট নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না বলে জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য ইতোমধ্যে অনুমোদিত নীতিমালা রয়েছে এবং সেটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসুর সাম্প্রতিক এসব কর্মকাণ্ডকে প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ‘দ্বৈত প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
প্রশাসনের ভাষ্য, ডাকসু শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও এর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও নীতিমালা মেনেই পরিচালিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প কাঠামো বা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মর্যাদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর মতো কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
ব্রেকিং