নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:৪১, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক রাখার মাধ্যমে এসব অনিয়ম আড়াল করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক আমলা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানকে নিয়োগ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং ওই সময়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।
ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানের তীব্র লোডশেডিংকে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এর ফলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার জনরোষের মুখে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা যাচাই এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স বাতিলের কথা জানিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব কেন্দ্র উৎপাদনে না থেকেও ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছিল, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়নি। একই সময়ে ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের আওতায় নেওয়া প্রকল্প ও চুক্তিগুলো কীভাবে বহাল রাখা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২০১০ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে ওই আইন করা হয়েছিল। আইনের অধীনে নেওয়া সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা না যাওয়ায় এটি ‘দায়মুক্তি আইন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্যদিকে দেড় বছরের শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল বকেয়া রেখে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কয়লা, গ্যাস আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ পরিশোধে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বকেয়া পরিশোধের চাপের মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় কয়লা ও গ্যাসের সরবরাহ সংকটে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বাতিল ৩৭ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। এসব প্রকল্পের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে ২৭টি সৌরবিদ্যুৎ, তিনটি বায়ুবিদ্যুৎ এবং একটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প ছিল। বাকি প্রকল্পগুলো বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের আওতায় ছিল।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর জন্য ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে লেটার অব ইনটেন্ট বা প্রাথমিক অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজও চলছিল।
বাতিল হওয়া ২৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোট সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৪০৪ মেগাওয়াট। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগ রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
এ ছাড়া ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ মেগাওয়াট, সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ১০০ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২২০ মেগাওয়াটের তিনটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১ মেগাওয়াটের একটি বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও নির্মাণের কথা ছিল।
পিডিবির আরও কয়েকটি নবায়নযোগ্য প্রকল্প দরপত্র মূল্যায়নের পর্যায়ে ছিল। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট, বড়পুকুরিয়ায় ২০ মেগাওয়াট এবং রাঙ্গুনিয়ায় ৫০ মেগাওয়াটের প্রকল্প ছিল। মহেশখালীতে যৌথ উদ্যোগে ১৬০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্রও মূল্যায়নাধীন ছিল।
এ ছাড়া কক্সবাজারের ইনানী ও চাঁদপুরে ৫০ মেগাওয়াট করে দুটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের পর সেগুলোও বাতিল করা হয়।
নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেও সাড়া কম
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে। মোট ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও এতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম ছিল।
মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়ে। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত সক্ষমতা ছিল প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।
বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে ‘সভরেন গ্যারান্টি’ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রকল্পের আর্থিক নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে এ ধরনের সরকারি গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা।
পিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, বাতিল হওয়া ৩৭টি প্রকল্পই দায়মুক্তি আইনের আওতায় প্রক্রিয়াধীন ছিল। কিন্তু এসব প্রকল্প বাতিলের পাশাপাশি একই আইনের আওতায় থাকা অন্য প্রকল্পগুলোকে বৈধতা দেওয়ায় সরকারের নীতিতে দ্বৈততা তৈরি হয়েছে।
তার মতে, প্রকল্পগুলো বাতিল না করা হলে এর কয়েকটি এরই মধ্যে উৎপাদনে যেতে পারত এবং বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকট কিছুটা কম থাকত।
বিদ্যুৎ খাত ‘আইসিইউতে’—টুকু
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশের বিদ্যুৎ খাত আগে থেকেই নাজুক ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
তার ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ বিদ্যুৎ খাতকে ‘আইসিইউতে’ নিয়ে গেছে। তিনি জানান, বাতিল হওয়া ৩৭টি এলওআইয়ের মধ্যে ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্মতিপত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
টুকুর দাবি, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব প্রকল্প বাতিল করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।
রামপাল প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকার অনেক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল করলেও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রামপাল প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে চুক্তি
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সফরের সময় ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে এলএনজি আমদানির বিষয়ে একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।
চুক্তিটি নিয়ে জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। চুক্তির ক্ষেত্রে টেন্ডার হয়েছিল কি না এবং প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলএনজি টার্মিনালগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া ছিল।
এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাওনা ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দেড় বছরের মেয়াদের মধ্যে প্রায় আট মাস বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করেনি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর থেকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে আর কোনো বিল দেওয়া হয়নি।
উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের বকেয়া পরিস্থিতি বর্তমান সরকারকে বড় ধরনের সমস্যায় ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল কি না।
তাদের অভিযোগ, দেড় বছরের সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ফাওজুল কবির খানের নীতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বিদ্যুৎ সংকট ও জনরোষের মুখে পড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
ব্রেকিং