জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী, তবু দমছে না এয়ারএশিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১১:৩৭, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী, তবু দমছে না এয়ারএশিয়া

মালয়েশিয়ার সেপাংয়ে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ থেকে উড্ডয়ন করছে এয়ারএশিয়ার একটি উড়োজাহাজ।-ছবি: সংগৃহীত

এয়ারএশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা টনি ফার্নান্দেস বলেছেন, জেট জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও তা সামাল দেওয়ার মতো শক্তিশালী তারল্য রয়েছে স্বল্পমূল্যের এই উড়োজাহাজ সংস্থাটির।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এবং এর শেয়ারের দাম প্রায় চার বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর শুক্রবার তিনি এ কথা বলেন।

ব্যাংককে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফার্নান্দেস বলেন, এয়ারএশিয়া নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এবং ডিসেম্বর বা জানুয়ারির মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রত্যাশা করছে। এর বেশিরভাগই বিদ্যমান ঋণ পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।

তিনি বলেন, “কোভিড পরিস্থিতি আমরা যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, তার তুলনায় অনেক, অনেক বেশি কঠিন ছিল। তখন আমরা উড়তে পারিনি, কিন্তু এখন আমরা উড়তে পারছি এবং আমাদের চাহিদা খুবই শক্তিশালী।”

রয়টার্সের দুই দিন আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, মালয়েশিয়া সরকার দেশটির বিমান সংস্থা মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও বাতিক এয়ারকে জিজ্ঞেস করেছে, তারা এয়ারএশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারের অংশ সামলাতে পারবে কি না।

সূত্রগুলো জানিয়েছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা এয়ারএশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পনার একটি অংশ।

ইরান যুদ্ধের কারণে জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবেই মে মাসে ঋণে জর্জরিত মার্কিন বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইনস ধসে পড়ে। সোমবার লাটভিয়ার এয়ারবাল্টিকও চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়াত্ব সুরক্ষার আবেদন করেছে।

এয়ারএশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি

৩০ জুন পর্যন্ত এয়ারএশিয়ার চলতি দায়ের পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন রিঙ্গিত, যা প্রায় ৪৫২ কোটি ডলারের সমান। বিপরীতে কোম্পানিটির নগদ অর্থ ও ব্যাংক হিসাবে ছিল ৯৫৪ মিলিয়ন রিঙ্গিত।

ফার্নান্দেস সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিতীয় প্রান্তিক ছিল এয়ারএশিয়ার জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিমানবাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এয়ারএশিয়া উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া সমন্বয় করায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করছেন।

লোকসানে থাকা এয়ারএশিয়ার জ্বালানি ব্যয় দ্বিতীয় প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেড়ে গড়ে প্রতি ব্যারেলে ১৮৩ ডলারে পৌঁছেছিল। কোম্পানিটির জ্বালানি দামের ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে কোনো হেজিং ব্যবস্থাও নেই।

রয়টার্স বুধবার প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে এয়ারএশিয়ার শেয়ারের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। শেয়ারের দাম ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে।

‘কেউ রাতারাতি এয়ারএশিয়ার জায়গা নিতে পারবে না’

মালয়েশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এয়ারএশিয়ার অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে আলটন এভিয়েশন কনসালট্যান্সিকে নিয়োগ দিয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এয়ারএশিয়ার গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার বিমান সংস্থাটিকে কোনো ধরনের সহায়তা দেবে কি না, তা বিবেচনা করছে বলে চলতি মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল।

ফার্নান্দেস বলেন, “গত ২৫ বছরে আমরা কখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। আজ পর্যন্তও পাইনি, এটাই বাস্তবতা।”

সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের উদ্ধার, বেইলআউট—কোনোটিরই প্রয়োজন নেই।”

ফার্নান্দেস আরও বলেন, মালয়েশিয়ায় এয়ারএশিয়ার ১০০টি উড়োজাহাজের জায়গা কেউ রাতারাতি নিতে পারবে না।

তার ভাষায়, “এর জন্য আপনাদের আমাদের খরচের কাঠামো, আমাদের ব্র্যান্ড, আমাদের বাজার এবং আমাদের নেটওয়ার্ক থাকতে হবে।”

এয়ারএশিয়া চলতি মাসে জানিয়েছিল, তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঋণবাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ডলার এবং স্থানীয়ভাবে ৭০০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের ঋণ সুবিধা নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। মূলত ঋণ পুনর্গঠনের জন্য এসব অর্থ সংগ্রহ করা হবে।

ফার্নান্দেস বলেন, “পুনঃঅর্থায়ন আসলে নতুন মূলধন সংগ্রহ নয়। এর উদ্দেশ্য হলো খরচ কমানো।”

তিনি জানান, একটি বড় বৈশ্বিক ব্যাংকের সঙ্গে বন্ড লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একজন বিনিয়োগকারী এয়ারএশিয়াকে ১০০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ বিষয়ে একটি টার্ম শিটও স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই এখনও বাকি। বিনিয়োগকারীর প্রস্তাবের চেয়ে আরও ভালো শর্ত পাওয়ার আশায় এয়ারএশিয়া অপেক্ষা করছে।

চতুর্থ প্রান্তিকে শক্তিশালী বুকিংয়ের আশা

ফার্নান্দেস জানান, তৃতীয় প্রান্তিকে এয়ারএশিয়ার ‘লোড ফ্যাক্টর’—অর্থাৎ বিমানের উপলব্ধ আসন কতটা পূরণ হচ্ছে—ছিল ৮০ শতাংশ। চতুর্থ প্রান্তিকের বুকিংও শক্তিশালী বলে তিনি জানান।

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে এয়ারএশিয়ার কার্যক্রম নিয়েও তিনি আশাবাদী।

ব্যয় কমাতে বিমান সংস্থাটি ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কম লাভজনক রুট বন্ধ করা হচ্ছে, ২৫টি পুরোনো উড়োজাহাজ ইজারাদাতাদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির শর্ত পুনরায় আলোচনা করা হচ্ছে।

ফার্নান্দেস বলেন, এয়ারএশিয়ার কোনো উড়োজাহাজ এখনো জব্দ করা হয়নি এবং ইজারাদাতারাও কোনো বিমান জোর করে ফেরত নেয়নি।

এয়ারএশিয়া জ্বালানি-সাশ্রয়ী এ৩২১এলআর ও এ৩২১এক্সএলআর উড়োজাহাজ ব্যবহারের কৌশলও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে বেশি জ্বালানি খরচকারী এ৩৩০ উড়োজাহাজগুলো ধীরে ধীরে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

সূত্র: রয়টার্স

আরও পড়ুন