আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১:২৭, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের আল-বিরিন শিবিরে সন্তানদের সঙ্গে বসে আছেন সাত সন্তানের মা রাওইয়া হাসান।-ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতির পর আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন হাজারো মানুষ। হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার মধ্যে গত দুই সপ্তাহে দেশটির অভ্যন্তরেই অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
পাশাপাশি প্রায় ৩ হাজার মানুষ অতিরিক্ত বোঝাই নৌকায় করে এডেন উপসাগর পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।
তাইজ প্রদেশের আল-বিরিন বাস্তুচ্যুত শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ৪৮ বছর বয়সী রাওইয়া হাসান সাত সন্তানকে নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কয়েক বছর আগে যুদ্ধের কারণে নিজ গ্রামের বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন তিনি। এবার যে শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখান থেকেও প্রাণ বাঁচাতে পালাতে হয়েছে তাকে।
রাওইয়া জানান, শিবিরের আশপাশে ভয়াবহ গোলাবর্ষণ শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা খালি পায়েই পালিয়ে যান। পালানোর সময় সন্তানদের কে কোথায় ছিল, সেটিও তারা বুঝতে পারেননি।
তিনি বলেন, “আমরা খালি পায়ে পালিয়েছি। সঙ্গে কিছুই নিতে পারিনি। কোনো চাদর, গদি, খাবার বা পানি—কিছুই ছিল না।”
আল-বিরিন শিবিরে এখন একটি অস্থায়ী মাটির চুলায় রুটি তৈরি করে সন্তানদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন রাওইয়া। চারদিকে ছোট ছোট কুঁড়েঘর ও বাবলা গাছের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলো।
রাওইয়ার বোন রাওদাও শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরদিন আল-বিরিন শিবিরে পৌঁছান। বর্তমানে তারা সম্পূর্ণভাবে ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। শিবির থেকে একটি কাঁচা রাস্তা পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। কাছেই রয়েছে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত উপকূলীয় এলাকা এবং তাইজ শহরের আরেকটি সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্ট।
মোচা দখলের পর বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি
গত সপ্তাহে হুথিরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোচা এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের বড় একটি অংশ দখলে নেওয়ার পর নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঢেউ শুরু হয়। অনেক মানুষ হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছেড়ে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সমুদ্রপথে জিবুতির দিকেও পাড়ি জমাচ্ছেন।
মোচা থেকে পালিয়ে আসা উম্মে মোহাম্মদ জানান, তার পরিবারের ওপর এটি ছিল আরও একটি বড় আঘাত। এর আগে চলমান যুদ্ধে তার এক ছেলে নিহত হয়েছিলেন। এবার হুথিদের অগ্রযাত্রার কারণে তাকেও পরিবার নিয়ে আবার ঘর ছাড়তে হয়েছে।
আল-ফিরদাউস শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর পরিবারটি একটি তাঁবুতে থাকার জন্য কয়েকটি পাতলা গদি ও পুরোনো কম্বল পেয়েছে। শিবিরের আশপাশে ছোট শিশুরা খেলছে। নারীরা পানির ট্যাংক থেকে বড় বালতিতে পানি সংগ্রহ করছেন। অন্যদিকে ত্রাণকর্মীরা বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে খাবার বিতরণ করছেন।
উম্মে মোহাম্মদ বলেন, “তারা আমাদের বালুর মধ্যে এনে রেখেছে। আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি।”
তিনি জানান, পালানোর সময় তাদের গবাদিপশু, পোশাক, কম্বলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে আসতে হয়েছে।
আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ইয়েমেন
ইরান-সমর্থিত হুথি এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটাই থেমে ছিল। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই তীব্র হয়েছে। হুথিরা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ইয়েমেনের ভেতরে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ অতিরিক্ত বোঝাই নৌকায় করে এডেন উপসাগর পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর সামনে এখন খাবার, পানি, আশ্রয় ও নিরাপত্তার সংকট আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স
ব্রেকিং