উটের জন্য পাসপোর্ট চালু করছে সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:৫৬, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

উটের জন্য পাসপোর্ট চালু করছে সৌদি আরব

ছবি : বিবিসি

উট খাতকে আরও সুশৃঙ্খল ও আধুনিক করতে উটের জন্য পাসপোর্ট বা দাপ্তরিক পরিচয়পত্র চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব সরকার। দেশটির পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদনশীলতা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতি আসবে এবং উট সংক্রান্ত একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক ডেটাবেইস গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উট পাসপোর্ট চালুর ফলে প্রতিটি উটের পরিচয়, মালিকানা, জাত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করা যাবে। এতে উট পালন ও বাণিজ্য আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।

মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই পাসপোর্টের নমুনা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সবুজ রঙের একটি পাসপোর্ট দেখা যায়, যার ওপর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় প্রতীক এবং সোনালি রঙের উটের ছবি রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে প্রায় ২২ লাখ উট রয়েছে, যা প্রতিবছর দেশটির অর্থনীতিতে দুই বিলিয়ন রিয়ালেরও বেশি অবদান রাখছে। আরব নিউজের তথ্যমতে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি উট রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় এক কোটি সত্তর লাখ আরব দেশগুলোতে বসবাস করে। উটের সংখ্যায় আরব বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া। এরপর রয়েছে সুদান, মৌরিতানিয়া, সৌদি আরব ও ইয়েমেন।

উট সৌদি আরবের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটিতে নিয়মিত উটের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যেখানে সেরা উটগুলো পুরস্কৃত হয়। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উটের উপস্থিতি সৌদি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।

ঐতিহাসিকভাবে আরব উপদ্বীপে উটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত মক্কা ও মদিনায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল উট। আফগানিস্তান, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্য থেকে আসা হাজিরা দীর্ঘ পথ উটের কাফেলায় পাড়ি দিয়ে হজ পালনে সৌদি আরবে পৌঁছাতেন। মরুভূমি অঞ্চলে পরিবহনের ক্ষেত্রে উট ব্যবহারের এই ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী পুরোনো।

গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবে পাথরে খোদাই করা উটের ভাস্কর্যগুলো বিশ্বে প্রাণীচিত্রের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনের অন্যতম হতে পারে। ২০১৮ সালে এগুলো আবিষ্কারের পর প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভাস্কর্যগুলো প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। তবে পরবর্তী গবেষণায় সেগুলোর বয়স সাত থেকে আট হাজার বছর নির্ধারণ করা হয়। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে এ সংক্রান্ত গবেষণার ফল প্রকাশ করে।

গবেষকদের মতে, এসব ভাস্কর্য তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন উট এখনো গৃহপালিত হয়নি এবং তখনকার সৌদি আরব আজকের মরুভূমির মতো শুষ্ক ছিল না; বরং সেখানে ছিল সবুজ ভূমি ও হ্রদ। ধারণা করা হয়, এসব স্থাপনা যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

সৌদি ইতিহাসবিদ বদর বিন সৌদ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উট আরব উপদ্বীপের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই শুষ্ক অঞ্চলে উট ছাড়া মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হতো। যদিও আধুনিক যুগে পরিবহনে উটের ব্যবহার কমেছে, তবুও উটের সঙ্গে সৌদিদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

‘মরুভূমির জাহাজ’ নামে পরিচিত উট ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বোঝা বহনে সক্ষম। একসময় বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো উটের মাধ্যমেই সিরিয়া, ইয়েমেনসহ দূরবর্তী অঞ্চলে যাতায়াত করত। এমনকি কয়েক দশক আগেও তেল শিল্পে উটের ব্যবহার দেখা গেছে।

বর্তমানে সৌদি আরবে উটভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। ‘স্বানি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান উটের দুধ ও দুধের গুঁড়া উৎপাদন করে ২৫টি দেশে রপ্তানি করছে। উটের দুধ দিয়ে আইসক্রিমও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ‘আবেল’ ব্র্যান্ড উটের লোম ও চামড়া দিয়ে পোশাক, ব্যাগ ও জুতা তৈরি করছে। কুমিরের চামড়ার পর উটের চামড়াকে সবচেয়ে টেকসই হিসেবে ধরা হয়।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে উট শিল্পকে তেলবহির্ভূত আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে, উট পাসপোর্ট প্রকল্প এই খাতকে আরও সংগঠিত করবে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি উট ব্যবসার প্রতি আস্থা বাড়াবে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পাসপোর্ট প্রতিটি উটের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও দাপ্তরিক পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে উটের স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্যিক লেনদেন ও আইনি প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন