দেশে বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে, গ্রামীণফোন সিইও

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৪৫, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

দেশে বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে, গ্রামীণফোন সিইও

ছবি: সংগ্রহীত

‘অতিরিক্ত করের বোঝা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধের’ কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম প্রধান টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান।

তার মতে, এই বিনিয়োগ অনীহার প্রভাব শুধু টেলিকম খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য খাতেও পড়ছে।

গত ৬ জানুয়ারি একাধিক গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ইয়াসির আজমান বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখন “খুবই, খুবই কম”। তিনি বলেন, এটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। শুধু গ্রামীণফোনের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সভাপতি হিসেবেও তিনি অন্য অপারেটরদের মধ্যেও একই শঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন।

বিনিয়োগে এই অনাগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, টেলিকম অপারেটরদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ রয়েছে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আর্থিক বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ বছর ধরে দেশে টেলিকম অপারেশন চললেও এমন একটি বছরও যায়নি, যখন অডিট আপত্তির পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে। গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক—তিনটি অপারেটরেরই বিনিয়োগকারীরা বিদেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতিতে তারা বাংলাদেশে নতুন করে বড় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

গ্রামীণফোনের মতো দেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যখন বিনিয়োগ অনাগ্রহের কথা বলা হচ্ছে, তখন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ১৫ জানুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে জানান, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মতে, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। দেশ হিসেবে চীন ও সিঙ্গাপুর শীর্ষ বিনিয়োগকারী। ইকুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত আয় এবং ইন্ট্রা-কোম্পানি ঋণ—সব ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণত প্রথম বছর বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়—এটি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা।

আর্থিক বিরোধের সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন) কথা বলেন ইয়াসির আজমান। তিনি জানান, গ্রামীণফোনের একারই অনিষ্পত্তিকৃত আর্থিক বিরোধের অঙ্ক প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। একই ধরনের সমস্যায় রয়েছে রবি ও বাংলালিংকও। তার মতে, দেশে আদালতের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় সুদের বোঝা আরও বাড়ছে, যা কোনো ব্যবসার জন্য টেকসই নয়। যেহেতু দেশে এখন আরবিট্রেশন আইন রয়েছে, তাই আন্তর্জাতিক সালিশির মাধ্যমে এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ইয়াসির আজমান বলেন, আন্তর্জাতিক সালিশির মাধ্যমে এই বিরোধগুলোর সমাধান হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে পারে। তা না হলে টেলিকমের মতো পুঁজি-নির্ভর খাত স্থানীয় বিনিয়োগ দিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে এবং এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলোও নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

মোবাইল সেবার করকাঠামো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন গ্রামীণফোনের সিইও। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের মতো উচ্চ কর অন্য কোথাও দেখা যায় না। প্রতি ১০০ টাকা আয়ের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ কর ও ভ্যাটে চলে যায়। এর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় এবং এসএমপি (সিগনিফিক্যান্ট মার্কেট পাওয়ার) নীতির কারণে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি নতুন সেবা চালু করতে নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন নিতে দীর্ঘ সময় লাগে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বিনিয়োগ অনীহার সম্পর্ক আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়াসির আজমান বলেন, বিনিয়োগকে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চান না। গ্রামীণফোন একটি বৈশ্বিক অপারেটর টেলিনরের নীতিমালা অনুসরণ করে চলে এবং সমস্যাগুলো আগেও ছিল, এখনো আছে।

একদিকে অপারেটররা লাভের চাপের কথা বলছে, অন্যদিকে গ্রাহকেরা মোবাইল ডেটা ও কলরেট বৃদ্ধিতে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ইয়াসির আজমানের মতে, বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করা গেলে এই দ্বিমুখী সংকট অনেকটাই কমে আসবে। তিনি জানান, গ্রাহকের ব্যয় বাড়লেও অপারেটরদের গ্রাহকপ্রতি আয় (আরপিইউ) তেমন বাড়েনি। গত বছর প্রতি মেগাবাইট ডেটার দাম ১১ শতাংশ কমানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ডেটার দামের বড় পার্থক্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, হোম ইন্টারনেটে কর ও ভ্যাট মাত্র ৫ শতাংশ, সেখানে মোবাইল অপারেটরদের দিতে হয় ৫৫ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধান থাকলে দামের পার্থক্য থাকবেই।

ডেটা ব্যবসা এখনো ভর্তুকি দিয়ে চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে ইয়াসির আজমান বলেন, ভয়েস কলের আয়ের কারণে এখনো ডেটায় ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে ভয়েস কলের ব্যবহার দ্রুত কমছে। এক সময় যেখানে দৈনিক ৪৫০ থেকে ৪৭০ মিলিয়ন মিনিট কল হতো, এখন ৩০০ মিলিয়ন মিনিটে পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে গ্রামীণফোন লাভজনক থাকবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী গত দেড় বছরে প্রায় ৯০ লাখ মোবাইল গ্রাহক কমে যাওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন গ্রামীণফোনের সিইও। তার মতে, আইএসপির ব্যবহার বাড়ায় মোবাইল সেবার ভলিউম সেখানে স্থানান্তরিত হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্বল সামষ্টিক অর্থনীতি ও উচ্চ দামের কারণেও গ্রাহকসংখ্যা কমছে।

টেলিকম খাতের ব্যর্থতার দিক হিসেবে কিস্তিতে স্মার্টফোন সরবরাহ করতে না পারার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিম লকের অনুমতি পাওয়ায় কিস্তিতে ফোন দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলে জানান।

সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশাবাদের কথা জানিয়ে ইয়াসির আজমান বলেন, টেলিকম নীতিমালা নিয়ে কাজ এগিয়েছে এবং নতুন স্পেকট্রাম নিলামের প্রস্তুতি খাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

 

 

সূত্র: বিডিনিউজ২৪

আরও পড়ুন