প্রকাশ: ১৭:২০, ১১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৭:১৬, ১৬ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। ডায়রিয়া চিকিৎসায় জীবনরক্ষাকারী খাবার স্যালাইন (ওআরএস) উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবন রক্ষার কৃতিত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু সেই বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিই এখন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অসঙ্গতির গুরুতর অভিযোগে আলোচনায়।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে ঘনিষ্ঠদের পদোন্নতি দেওয়া, স্ত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর চেষ্টা, বিদেশ সফর ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণে অনিয়ম এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতা এককভাবে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীর দাবি, এসব কারণে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আইসিডিডিআর,বির সুশাসন, গবেষণার পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি।
২০২১ সালের ১ মার্চ আইসিডিডিআর,বির ৬০ বছরের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. তাহমিদ আহমেদ। তাঁর নিয়োগে প্রতিষ্ঠানজুড়ে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশ্বাস ছিল, একজন বাংলাদেশির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু চার বছরের মাথায় সেই প্রত্যাশার জায়গায় এসেছে অসন্তোষ, অভিযোগ ও প্রশ্ন।
অভিযোগের শুরু ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ নিয়ে। সূত্র বলছে, উপনির্বাহী পরিচালকের (Deputy Executive Director) মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখা হয়। কিন্তু একই সময়ে নির্বাহী পরিচালক হয়েও প্রায় **তিন বছর নয় মাস** নিউট্রিশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র পরিচালকের দায়িত্ব নিজের কাছেই রাখেন ড. তাহমিদ। অর্থাৎ— নির্বাহী পরিচালক, কার্যত দ্বিতীয় নির্বাহী নেতৃত্বের দায়িত্ব, বৈজ্ঞানিক বিভাগের প্রধান—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি ক্ষমতা ভাগ না করার কৌশল?
হেলথ সিস্টেমস বিভাগের সিনিয়র পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক মানের সিনিয়র বিজ্ঞানীরা থাকা সত্ত্বেও নতুন কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে নিজেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান হন ড. তাহমিদ। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এতে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং যোগ্য বিজ্ঞানীরা বঞ্চিত হয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি তাঁর স্ত্রী ডা. সায়েরা বানুকে ঘিরে। সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র পরিচালকের আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। যদিও তাঁর গবেষণা দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে একজন নির্বাহী পরিচালকের স্ত্রীকে একই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ায় স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে পরে তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, লিগ্যাল, রিসার্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কমিউনিকেশনস—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে আগে নতুন উচ্চপদ সৃষ্টি করা হয়। এরপর সেই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় নির্বাহী পরিচালকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের। পরে পুরোনো পদ বিলুপ্ত করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এটি ছিল নিয়মিত পদোন্নতি নয়; বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে প্রশাসনিক কাঠামোই পরিবর্তন করা হয়েছে।
ড. তাহমিদ আহমেদের বিরুদ্ধে আরও তিনটি গুরুতর আর্থিক অভিযোগ উঠেছে। প্রথম অভিযোগ, তাঁর কন্যার যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার টিউশন ফি পরিশোধে এমন একটি সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে, যা সাধারণত বিদেশি কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত। প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের দায়িত্বে থাকা অন্য বাংলাদেশি কর্মকর্তারা যখন এই সুবিধা পাননি, তখন তাঁর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন?
আরেক অভিযোগ তাঁর স্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করে আইসিডিডিআর,বির অর্থায়নে বিজনেস ক্লাসে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন তিনি। সেখানে স্বল্প সময়ের একটি বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনায় অংশ নেওয়ার পর কয়েক দিন ব্যক্তিগতভাবে অবস্থান করেন, যেখানে তাঁদের কন্যা পড়াশোনা করেন। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক সফরের সুযোগ কি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়েছে?
করোনা মহামারির সময় তৎকালীন উপনির্বাহী পরিচালকের বেতন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগটি সত্য হলে এটি আর্থিক নীতিমালা ও বৈদেশিক লেনদেনের বিধি লঙ্ঘনের বিষয় হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, ড. তাহমিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বর্তমান মানবসম্পদ উপদেষ্টা ড. মোশাররফ হোসেন দীর্ঘদিন প্রশাসনিক নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাহী পরিচালকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি অবসরের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পরও নীতিমালা পরিবর্তন করে তাঁকে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানী অভিযোগ করেন, আইসিডিডিআর,বিতে এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাঁদের দাবি, এতে যোগ্য বিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন কমছে, গবেষণার স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছেও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং স্বাধীন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
ব্রেকিং