চোখে বিশ্বাস নেই’: ইনকাদের হারানো নগরীর সন্ধানে ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৫১, ২২ আগস্ট ২০২৬

চোখে বিশ্বাস নেই’: ইনকাদের হারানো নগরীর সন্ধানে ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’

ইনকাদের হারানো প্রাচীন নগরীর সন্ধান, অভিযানে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স-ছবি/ বিবিসি

পেরুর দুর্গম আন্দিজ পর্বতমালার গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি প্রাচীন নগরীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রহস্যের শেষ নেই। ধারণা করা হতো, স্প্যানিশদের আগ্রাসনের সময় ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল এই নগরী। তবে বহু বছর ধরে এর সঠিক অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদ ও অভিযাত্রীদের মধ্যে মতভেদ ছিল।

১৯১১ সালে মার্কিন গবেষক হাইরাম বিংহাম তৃতীয় দাবি করেন, তিনি ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া রাজধানী ভিলকাবাম্বার সন্ধান পেয়েছেন। তার দেখানো স্থানটি ছিল আজকের বিশ্বখ্যাত মাচু পিচু। তবে কয়েক দশক পর তার সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

১৯৬৪ সালে মার্কিন অভিযাত্রী জিন স্যাভয় পেরুর দুর্গম জঙ্গলে অবস্থিত এসপিরিতু পাম্পা এলাকায় পৌঁছান। মাচু পিচুর প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই এলাকায় তিনি বিশাল কিছু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। স্যাভয়ের ধারণা হয়, এটিই হয়তো ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী ভিলকাবাম্বা।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে ওই এলাকায় যেতে তাদের পথ দেখাতে রাজি হননি। স্থানীয় বিশ্বাস ছিল, এই পবিত্র স্থানের অবস্থান বাইরের মানুষকে জানালে দেবতাদের ক্রোধ নেমে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাদের রাজি করিয়ে স্যাভয় ও তার সঙ্গী আন্তোনিও সান্তান্দের কাসেল্লি ধ্বংসাবশেষে পৌঁছান।

তারা সেখানে পাহাড়ের তিনটি স্তরে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনার সন্ধান পান। এর মধ্যে ছিল প্রাসাদ, পাথরের তৈরি ভবন ও ঝরনা। প্রথম স্তরটির আয়তন মাচু পিচুর তুলনায় কয়েক গুণ বড় ছিল বলে অভিযাত্রীরা জানান।

তবে অনুসন্ধান সহজ ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথ, নদীর প্রবল স্রোত এবং ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তাদের এগোতে হয়। স্থানীয় গাইডদের একটি অংশ পরে নানা কুসংস্কারের কারণে দল ছেড়ে চলে যায়।

স্যাভয়ের অভিযানের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর সেখানে পৌঁছায় বিবিসির একটি দল। তাদের যাত্রাপথও ছিল অত্যন্ত কঠিন। নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়া, খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠা এবং ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হয় তাদের।

ধ্বংসাবশেষে পৌঁছে বিবিসি দলও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন দেখতে পায়। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কয়েকটি ছাদের টালি। ইনকারা সাধারণত ভবনের ছাদে খড় ব্যবহার করত। কিন্তু পাওয়া টালিগুলোতে স্প্যানিশ নকশার সঙ্গে ইনকা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়।

পরবর্তীতে ইনকা ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ জন হেমিং ঐতিহাসিক নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে এসপিরিতু পাম্পার ধ্বংসাবশেষের মিল খুঁজে পান। ষোড়শ শতকের ধর্মযাজক মার্তিন দে মুরুয়ার বর্ণনায় ইনকার নির্বাসিত রাজধানীতে বিভিন্ন স্তরে নির্মিত একটি প্রাসাদ এবং টালির ছাদের উল্লেখ ছিল। এই তথ্য নতুন করে ওই স্থানটিকে ভিলকাবাম্বা হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ১৯১১ সালে হাইরাম বিংহাম যে হারানো নগরী খুঁজছিলেন, তার প্রকৃত অবস্থানের খুব কাছ দিয়েই তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য সংকট এবং অভিযানের নানা সমস্যার কারণে তিনি দ্রুত সেখান থেকে সরে যান। পরে মাচু পিচুকেই হারানো ইনকা রাজধানী হিসেবে মনে করেন।

স্যাভয়ের আবিষ্কার শেষ ইনকা রাজধানী সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়। তবে নগরীটি নিয়ে রহস্য পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিশেষ করে ইনকাদের হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণ ও মূল্যবান সম্পদের কোনো নিশ্চিত সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

ঘন জঙ্গলে ঢাকা ওই প্রাচীন নগরীর বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়নি। ফলে শেষ ইনকা রাজধানী ও এর সম্পদ নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন ভবিষ্যতেও ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে থাকবে। 

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন