নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১:১৬, ২ জানুয়ারি ২০২৬
আল্লাহ কর্তৃক নবী-রাসুলগণের মাধ্যমে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনা বা নিদর্শনকে প্রদর্শনকে মুজিযা বলা হয়, যা তাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবিকে সত্য প্রমাণ করে এবং যা মানুষের সাধারণ জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরে। নবী-রাসুলগণের মুজিযা সত্য এবং তার ওপর ইমান আনা বা বিশ^াস রাখাও আবশ্যক। পবিত্র কোরআনের সুরা রাদের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছি। কোনো রাসুলের এমন সাধ্য ছিল না যে আল্লাহর দির্দেশ ছাড়া কোনো নিদর্শন উপস্থিত করবে। প্রত্যেকটি বিষয়ের নির্ধারিত কাল লিপিবদ্ধ।’ আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণের ন্যায় বিশ^নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও কিছু মুজিযা দান করেন, কতিপয় অলৌকিক ঘটনা ও নিদর্শনের সাক্ষী বানান; যেটি তার শ্রেষ্ঠত্ব ও দাওয়াত প্রমাণে এবং দ্বীন প্রচারে কাজে আসে। তবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুজিযা ছিল পবিত্র কোরআন। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে পবিত্র কোরআনের বিশেষত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও অলৌকিকত্ব তুলে ধরা হলো।
পৃথিবীর বড় বিস্ময় : বৈচিত্রময় এই পৃথিবীতে বিস্ময়ের অনেককিছু আমাদের চোখে পড়ে। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় পবিত্র কোরআন। আধুনিক বিশে^ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পৃথিবীতে বিদ্যমান ও কাল্পনিক অনেক বস্তুর অনুরূপ বা কপি প্রস্তুত করা সম্ভব হলেও কোরআনের অনুরূপ রচনা বা গ্রন্থ উপস্থাপন অসম্ভব। কোরআনের সত্যতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশেষত্ব প্রমাণে এটি এক চ্যালেঞ্জ; যা অবতীর্ণের পর থেকে এখন পর্যন্ত এ চ্যালেঞ্জে কেউ সফল হয়নি এবং এটা সম্ভবও নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তোমরা আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ কিতাবে সন্দিহান হও, তবে তোমরা অনুরূপ একটি সুরা রচনা কর। আর সত্যবাদী হলে তোমরা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের সাহায্যকারীদের ডেকে নাও। তারপরও যদি তোমরা এ কাজ করতে না পার আর এটা তো নিশ্চিত যে, তোমরা তা কখনও করতে পারবে না, তবে ভয় কর সেই আগুনকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। তা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা : ২৩-২৪)।
তিলাওয়াত ও শ্রবণে বিরক্তি না আসা : এখন থেকে প্রায় পনের শ বছর আগে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়। অবতীর্ণের পর থেকে নামাজে এবং নামাজের বাইরে এর তিলাওয়াত-শ্রবণ, শেখা ও শেখানোর রীতি চলে আসছে। পাঠকারী কোরআন পাঠ করে কেবল অতৃপ্তই থেকে যায়, কোনো ক্লান্তি আসে না; উপরন্তু অন্তরে আল্লাহভীতি পয়দা হয়, ইমানে তারাক্কি আসে এবং তনুমন আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী- এমন এক কিতাব যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসামঞ্জস্য, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্ত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটা আল্লাহর হেদায়েত, যার মাধ্যমে তিনি যাকে চান সঠিক পথে নিয়ে আসেন আর আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন, তাকে সঠিক পথে আনার কেউ নেই।’ (সুরা যুমার : ২৩)।
আয়ত্তকরণ ও উপদেশ গ্রহণে সহজতা : পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়। এর শব্দবিন্যাস, ছন্দ-সৌন্দর্য, অন্তর্নিহিত শক্তি ও গভীরতা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। তবে কোরআন যেহেতু দল, মত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের হেদায়েতের জন্যই এসেছে, সেহেতু মানবজাতির জন্য কোরআনকে সহজ করা হয়েছে। সাধারণত যেখানে দেখা যায়- অতি মেধাবীদের জন্য অন্য যেকোনো বইয়ের ধারাবাহিক কয়েক পৃষ্ঠা মুখস্থ করা বা বলতে পারা কঠিন, সেখানে ৮-১০ শিশু-কিশোর পবিত্র কোরআনের মতো বৃহৎ একটি কিতাব ধারাবাহিকভাবে মুখস্থ পড়ে যাচ্ছে। এটি আল্লাহর বিশেষ করুণা এবং পবিত্র কোরআনের বৈশিষ্ট্য ও অলৌকিকত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে নবী,) আমি এ কোরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা আদ-দুখান : ৫৮)।
পবিত্র কোরআনে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং (হে নবী,) আমি আপনার ভাষায় কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যেন আপনি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দিতে পারেন আর এর দ্বারা বিবাদকারী ঝগড়াটে লোকদেরকে সতর্ক করতে পারেন।’ (সুরা মারইয়াম : ৯৭)।
মর্যাদা বৃদ্ধি ও মুক্তির নিশ্চয়তা : পবিত্র কোরআন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এক জীবন্ত মুজিযা। অতীতে অন্য কোনো নবী-রাসুলকে এমন মুজিযা দেওয়া হয়নি। এটি পৃথিবীবাসীকে আলোকিত পথের সন্ধান দেয়, সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং চূড়ান্ত মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে নবী,) এটি এমন একটি কিতাব, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর ভেতর নিয়ে আসতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম : ০২)।
হজরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (জামে তিরমিজি : ২৯০৭)। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার রব, আমি একে দিনের বেলায় খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে আমর রব, আমি রাতের বেলায় তাকে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৬৬২৬)।
পবিত্র কোরআন শেখা-শেকানো এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টতা যেমনিভাবে কল্যাণ ও মুক্তির বার্তা দেয়, তেমনি কোরআন থেকে দূরে থাকা, তার প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা ও অসম্মান প্রদর্শন পার্থিব-পরকালের নানা সংকট ও সমস্যা ডেকে আনে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আমার উপদেশ (কোরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাব। সে বলবে, হে রব্ব! তুমি আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম! আল্লাহ বলবেন, এভাবেই তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আজ সেভাবেই তোমাকে ভুলে যাওযা হবে।’ (সুরা ত্বহা : ১২৪-১২৬)।
ব্রেকিং