নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:৪৯, ১৮ আগস্ট ২০২৬
নাজমুল হাসান/ ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব ও ঢাকা কলেজকেন্দ্রিক আন্দোলন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাত্রনেতা নাজমুল হাসান বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু একটি সরকারের পতন নয়; বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তবে আন্দোলনের দুই বছর পরও সেই প্রত্যাশিত পরিবর্তনের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমুল হাসান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে গণঅভ্যুত্থানের সময়কার অভিজ্ঞতা, আন্দোলন সংগঠনের নানা চ্যালেঞ্জ, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেন।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুনে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছাত্র অধিকার পরিষদ প্রথমদিকে কর্মসূচি শুরু করে। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মে আন্দোলন পরিচালনার কৌশল নেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ৯ জুন নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব এলাকায় কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ঢাকা কলেজসহ সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
নাজমুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ঢাকা কলেজ এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় আন্দোলন সংগঠিত করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হামলা, নজরদারি ও হুমকির মধ্যেও তিনি শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার কাজ চালিয়ে যান।
আন্দোলনের সময় নিজের ওপর হামলার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে হামলার শিকার হয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন। সে সময় কয়েকটি গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবরও প্রচারিত হয়েছিল বলে জানান তিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন এই ছাত্রনেতা।
তার দাবি, আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকার কারণে তার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি ও হয়রানি বাড়ানো হয়েছিল। ঢাকার বাসা ও গ্রামের বাড়িতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শুধু সরকার পতন নয়, ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা
নাজমুল হাসান বলেন, ২০১৮ সাল থেকেই তারা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছিলেন যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে। তবে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণে শুরুতেই সরকার পতন হবে—এমন প্রত্যাশা তাদের ছিল না। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে বৃহত্তর গণআন্দোলন তৈরির পরিকল্পনা ছিল বলে জানান তিনি।
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, বেকারত্ব কমানো এবং বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু গত দুই বছরে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি এবং সরকারি শূন্য পদেও প্রত্যাশিত নিয়োগ হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের ফলে মানুষ তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে থাকতে পারছে—এটি অবশ্যই একটি অর্জন। কিন্তু আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া মানুষের প্রত্যাশা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও কার্যকর মানবাধিকার কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্দোলন পরবর্তী বিভাজন নিয়েও ক্ষোভ
গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, সেটিকেও দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন নাজমুল হাসান।
তার মতে, আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা কলেজ, সাত কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের শিক্ষার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের স্বীকৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
তিনি মনে করেন, আন্দোলনের পর নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠায় অন্য অংশগ্রহণকারীদের অবদান আড়ালে পড়ে যায়। এর ফলে যে ঐক্যের ভিত্তিতে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিভাজন তৈরি হয়েছে।
কেমন বাংলাদেশ চান
আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে নাজমুল হাসানের প্রত্যাশা—দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে। রাজনৈতিক মতের ভিন্নতার কারণে যেন কেউ দমন-পীড়নের শিকার না হন এবং মানুষের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে—এমন রাষ্ট্র চান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোকে নিরাপদ করার ওপরও গুরুত্ব দেন এই ছাত্রনেতা। তার মতে, ক্যাম্পাসে অস্ত্রের রাজনীতি, গণরুম-গেস্টরুমের মতো নির্যাতনমূলক সংস্কৃতি এবং সংঘাতের পরিবেশ আর ফিরে আসা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা ও গবেষণা করতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য।
এ ছাড়া তরুণ ও বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। তার প্রত্যাশা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
ব্রেকিং