নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২:১২, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগ্রহীত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও তাদের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)-এর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যান্সারই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই গবেষণায় ক্যান্সারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩০টি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তামাক ও অ্যালকোহল গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বায়ুদূষণ, অতিবেগুনি রশ্মি এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নয় ধরনের সংক্রমণ।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রায় ৭ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। গবেষকরা বলছেন, এই রোগীদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ক্যান্সার এড়ানো সম্ভব ছিল। ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্যান্সারের বোঝা কমার বদলে আরও বেড়েছে।
এই গবেষণা ১৮৫টি দেশ ও ৩৬ ধরনের ক্যান্সারের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নতুন ক্যান্সার রোগীদের প্রায় ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী তামাক ব্যবহার। অ্যালকোহল সেবনের কারণে প্রায় ৪ শতাংশ ক্যান্সার হচ্ছে। এ ছাড়া বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত শারীরিক ওজন এবং শরীরচর্চার অভাবও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—যেগুলো সবই প্রতিরোধযোগ্য।
গবেষণায় আরও বলা হয়, প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের প্রায় অর্ধেক আসে মাত্র তিন ধরনের ক্যান্সার থেকে—ফুসফুস, পাকস্থলী ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার। ফুসফুসের ক্যান্সার মূলত ধূমপান ও বায়ুদূষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পাকস্থলীর ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। আর জরায়ুমুখের ক্যান্সার ছড়ায় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণের মাধ্যমে। এই তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রতিরোধের উপায় ইতোমধ্যে জানা রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের পেছনের মানবিক গল্পও কম নয়। ঢাকার উপকণ্ঠে বসবাসকারী ৫৫ বছর বয়সী আবদুল করিম দীর্ঘদিন পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। প্রতিদিন এক প্যাকেটের বেশি সিগারেট খাওয়া ছিল তার অভ্যাস। কর্মস্থলের ভেতরে ও বাইরে দূষিত বাতাসে কাজ করলেও বিষয়টি কখনো গুরুত্ব দিয়ে ভাবেননি। পরে কাশি ও রক্তক্ষরণ শুরু হলে পরীক্ষায় ধরা পড়ে ফুসফুসের ক্যান্সার। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিনের ধূমপান ও বায়ুদূষণই এর মূল কারণ। করিমের ভাষায়, আগে সচেতন হলে হয়তো এই রোগ এড়ানো যেত।
একইভাবে ৩৮ বছর বয়সী শারমিন আক্তার আক্রান্ত হয়েছেন জরায়ুমুখের ক্যান্সারে। গ্রাম থেকে শহরে এসে গার্মেন্টসে কাজ করা শারমিনের এইচপিভি টিকা বা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। শারীরিক সমস্যা শুরু হলেও লজ্জা ও ভয় থেকে চিকিৎসা নেননি। পরে দেরিতে হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন, সময়মতো টিকা ও স্ক্রিনিং থাকলে এই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে নতুন ক্যান্সারের প্রায় ৪৫ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে ধূমপান সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলেও নারীদের ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ ও অতিরিক্ত ওজন বড় ভূমিকা রাখছে।
অঞ্চলভেদে ঝুঁকির ধরনও আলাদা। কোথাও বায়ুদূষণ প্রধান কারণ, কোথাও সংক্রমণ বা জীবনযাপনের ধরন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি, কারণ সেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও দুর্বল।
বাংলাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফরুক জানান, সীমিত গবেষণার ভিত্তিতে দেশে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে, এবং এই সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ, ভেজাল খাদ্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি। এসবের বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
আইএআরসি’র ক্যান্সার নজরদারি ইউনিটের উপ-প্রধান ড. ইসাবেল সোয়েরজোমাতারাম বলেন, এটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ। তার মতে, আচরণগত, পরিবেশগত ও সংক্রামক ঝুঁকিগুলো কমাতে পারলে ক্যান্সারের বৈশ্বিক বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ও শ্রমনীতির সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
ব্রেকিং