মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়া রক্ষায় যা খাবেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯:১২, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুখের উপকারী ব্যাকটেরিয়া রক্ষায় যা খাবেন

ছবি/ বিবিসি

চিনি জাতীয় খাবার দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি তৈরি করতে পারে—এ কথা প্রায় সবাই জানেন। কারণ এসব খাবার মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে মুখের ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু কী খাবেন না, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কী খাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ফল থেকে শুরু করে পনির—মুখের জন্য উপকারী কিছু খাবার আপনার ধারণার চেয়েও ভিন্ন হতে পারে।

গবেষণায় ধীরে ধীরে মুখের অণুজীবসমাজ বা ‘ওরাল মাইক্রোবায়োম’-এর গুরুত্ব সামনে আসছে। এতে প্রায় ৭০০ ধরনের ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ভাইরাস, ছত্রাক এবং অন্যান্য অণুজীব রয়েছে। এসব অণুজীব আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিষয়টি এখনও অনেকটাই উপেক্ষিত।

মুখের এসব অণুজীবকে সুস্থ রাখা খুব কঠিন নয়। অন্ত্রের অণুজীবসমাজের মতো মুখের মাইক্রোবায়োমের ওপরও খাদ্যাভ্যাসের বড় প্রভাব রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর দাঁত ও মুখের জন্য কী ধরনের খাবার উপকারী, তা জানা জরুরি।

মুখে অণুজীবের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ

মুখের ভেতরে থাকা অণুজীবগুলো বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের বসতি তৈরি করে। প্রতিটি প্রজাতি সাধারণত নির্দিষ্ট পরিবেশ পছন্দ করে। কিছু ব্যাকটেরিয়া দাঁতের পৃষ্ঠে থাকে, আবার কিছু জিহ্বায় কিংবা দাঁত ও মাড়ির মধ্যকার ক্ষুদ্র ফাঁকে অবস্থান করে।

এর মধ্যে কিছু ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর। যেমন স্ট্রেপ্টোকক্কাস মিউটানস দাঁতের ওপর বসবাস করে এবং চিনি খেতে পছন্দ করে। এটি চিনি থেকে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। ধীরে ধীরে এর ফলে দাঁতে গর্ত বা ক্যাভিটি তৈরি হয়।

অন্যদিকে, কিছু ব্যাকটেরিয়া মুখের জন্য উপকারী। যেমন ভেইলোনেলা, অ্যাক্টিনোমাইসিস, কিছু স্ট্রেপ্টোকক্কাস ও নাইসেরিয়া প্রজাতি ক্ষতিকর জীবাণুকে মুখে স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে বাধা দিতে পারে।

মুখের অণুজীবসমাজের ভারসাম্য শুধু দাঁত ও মাড়ির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিয়মিত ও ভালোভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে দাঁত ও মাড়ির মাঝের অংশে ছোট ছোট পকেট তৈরি হতে পারে। সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় পোরফাইরোমোনাস জিঞ্জিভালিস-এর মতো ব্যাকটেরিয়া সহজে বেড়ে উঠতে পারে।

এই ব্যাকটেরিয়া মাড়ির রোগের পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ, বিষণ্নতা, আলঝেইমার রোগ, ডায়াবেটিস, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুখের অণুজীবসমাজের ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে কোলন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের লালা পরীক্ষা করে পরবর্তী সময়ে তাদের ক্যানসারের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের মুখের অণুজীবসমাজে দাঁতের ক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যাকটেরিয়া বা ক্যান্ডিডা নামের ছত্রাক ছিল, তাদের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।

মুখের অণুজীবের বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মুখের অণুজীবের বৈচিত্র্য কম থাকার সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে শুধু দাঁত ব্রাশ করাই মুখের অণুজীবসমাজ সুস্থ রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা যা খাই, মুখের অণুজীবগুলোর ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

অতিরিক্ত চিনি রয়েছে এমন খাবার ও পানীয় কমানো উচিত। কারণ মুখের ক্যাভিটি সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া এসব চিনি দ্রুত ব্যবহার করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেটও কমানো ভালো। সাদা পাউরুটি, ক্র্যাকার, বিস্কুট, কেক ও প্রিটজেলের মতো স্টার্চযুক্ত খাবার মুখে সহজেই চিনিতে পরিণত হতে পারে।

উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে খাবার ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করে। কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া আবার সরাসরি ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক লরা ওয়েইরিখের মতে, স্ট্রেপ্টোকক্কাস পরিবারের কিছু ব্যাকটেরিয়া খুব বেশি অ্যাসিড তৈরি করে না। বরং তারা অ্যাসিড উৎপাদনকারী ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে এস. স্যালিভেরিয়াস এমন কিছু প্রোটিন তৈরি করে, যা বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম।

শাকসবজি হতে পারে উপকারী

মুখের অণুজীবসমাজ সুস্থ রাখতে প্রচুর শাকসবজি খাওয়া উপকারী হতে পারে। কেল, পালংশাক, বিট ও মূলার মতো খাবারে প্রচুর নাইট্রেট থাকে। মুখের নাইসেরিয়া ব্যাকটেরিয়া এই নাইট্রেট ব্যবহার করে নাইট্রাইট তৈরি করে। পরে অন্ত্রের কিছু ব্যাকটেরিয়া সেটিকে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তর করে। রক্তে নাইট্রিক অক্সাইড রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

রসুনও মুখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। কাঁচা রসুন চিবিয়ে খেলে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে, তবে এতে থাকা অ্যালিসিন নামের একটি রাসায়নিক দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির রোগের জন্য দায়ী কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।

বেশি পরিমাণে উদ্ভিদজাত খাবার খাওয়ার আরেকটি সুবিধা হলো এতে পলিফেনল থাকে। এগুলো উদ্ভিদের তৈরি বিশেষ ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উদ্ভিদের কোষকে রক্ষা করে।

চায়ের মধ্যেও পলিফেনল রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চায়ের পলিফেনল ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমাতে পারে। একই সঙ্গে এসব ব্যাকটেরিয়াকে একত্র হয়ে দাঁতের পৃষ্ঠে লেগে থাকতেও বাধা দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, চা মুখের দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জিহ্বার পেছনের কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।

ফল, মধু ও পনিরের ভূমিকা

গাঢ় রঙের বেরিসহ অনেক ফলে প্রচুর পলিফেনল রয়েছে। ফলে চিনি ও অ্যাসিড থাকার কারণে এগুলো দাঁতের জন্য ক্ষতিকর মনে হলেও কিছু ফল বরং উপকারী হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্র্যানবেরির রস দাঁতে প্লাক তৈরির প্রক্রিয়া কমাতে এবং ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

মধুতেও প্রচুর পলিফেনল রয়েছে। গবেষণায় এটি দাঁতে প্লাক তৈরি কমানো এবং ক্যাভিটি সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করার সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

পনিরও মুখের অণুজীবসমাজের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে। ইতালির একটি ছোট গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের পাঁচ দিন গ্রানা পাদানো পনির খাওয়ানো হয়। পরে তাদের মুখের ব্যাকটেরিয়ার গঠনে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। চিনি পছন্দ করা এস. মিউটানস কমে এবং স্বাস্থ্যকর মুখে বেশি পাওয়া যায় এমন এস. স্যাঙ্গুইনিস ব্যাকটেরিয়া বাড়ে।

পনির চিবানোর সময় লালা বেশি তৈরি হয়। লালা মুখের অতিরিক্ত চিনি সরাতে এবং ব্যাকটেরিয়ার তৈরি অ্যাসিডের প্রভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করে।

কেফিরের মতো গাঁজন করা খাবারেও উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। এগুলো ক্ষতিকর জীবাণুর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কেফির কিছু ক্ষতিকর মুখের ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম কমাতে এবং তাদের আঠালো স্তর তৈরিতে বাধা দিতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস

ইতালির কাতানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক গায়েতানো ইসোলা বলেন, মুখের স্বাস্থ্যের জন্য কোনো একটি খাবারকে ‘সুপারফুড’ বলা ঠিক নয়। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, নিয়মিত পরিশোধিত চিনি ও সহজে গাঁজনযোগ্য কার্বোহাইড্রেট খেলে অ্যাসিড তৈরি ও সহ্য করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে মুখের অণুজীবসমাজের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

অন্যদিকে, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, গোটা ফল ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি এবং পরিশোধিত চিনি কম রয়েছে—এমন খাদ্যাভ্যাস মুখের অণুজীবসমাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশি সহায়ক।

ইসোলার সঙ্গে যুক্ত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভূমধ্যসাগরীয় ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন—যেখানে ফল, সবজি, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি থাকে—তাদের মাড়ির রোগ তুলনামূলক কম গুরুতর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

লাল মাংস বেশি খাওয়ার সঙ্গে মাড়ির রোগের তীব্রতার একটি সম্পর্কও গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এর সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। একটি সম্ভাবনা হলো, মাংসের প্রোটিন এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে ক্ষতিকর কিছু ব্যাকটেরিয়া সহজে বেড়ে ওঠে।

দাঁত ব্রাশ ও ফ্লসিংও জরুরি

খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হলেও দাঁত ব্রাশ ও ফ্লসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় না। নিয়মিত ফ্লসিং দাঁতের ক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত এস. মিউটানস ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমানোর সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার করলে দাঁতের রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন অণুজীবের সংখ্যা কমে।

তবে বাজারে পাওয়া সাধারণ মাউথওয়াশ দীর্ঘমেয়াদে মুখের অণুজীবসমাজে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে এমন মাউথওয়াশ তৈরির আশা করা হচ্ছে, যা সব ব্যাকটেরিয়া কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ক্ষতিকর ও উপকারী অণুজীবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

অন্যদিকে, ক্লোরহেক্সিডিনযুক্ত কিছু মাউথওয়াশ মুখের অণুজীবসমাজের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এগুলো মাড়ির রোগ ও কিছু মুখের সমস্যার চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মুখের অণুজীবসমাজ সুস্থ রাখতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা। শাকসবজি, বিশেষ করে পাতাযুক্ত সবজি, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও পূর্ণাঙ্গ খাবার বেশি খাওয়া এবং অতিরিক্ত চিনি, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় কমানো উপকারী হতে পারে।

অর্থাৎ, স্বাস্থ্যকর খাবার শুধু শরীরের জন্যই নয়—মুখের ভেতরে থাকা উপকারী অণুজীবগুলোর জন্যও ভালো। 

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন