আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০০:০০, ১০ আগস্ট ২০২৬
ছবি/ বিবিসি
অনেকেরই অভ্যাস আছে আঙুলের গিঁট ফাটানোর। কেউ এটি করেন অজান্তেই, আবার কারও কাছে গিঁট ফাটানোর শব্দ ও অনুভূতিই স্বস্তিদায়ক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণা হলো—নিয়মিত আঙুলের গিঁট ফাটালে নাকি আর্থ্রাইটিস হতে পারে। তবে গবেষণা বলছে, এই ধারণার পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ নেই।
শৈশবে ডোনাল্ড উঙ্গারকেও তার মা, কয়েকজন খালা এবং পরে শাশুড়ি সতর্ক করেছিলেন, নিয়মিত আঙুলের গিঁট ফাটালে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। তাদের ভুল প্রমাণ করতে তিনি ৫০ বছর ধরে প্রতিদিন অন্তত দুবার বাঁ হাতের আঙুলের গিঁট ফাটিয়েছেন। অন্যদিকে ডান হাতের গিঁট তিনি ফাটাননি।
১৯৯৮ সালে ৭২ বছর বয়সে নিজের দুই হাতের এক্স-রে করান উঙ্গার। ফলাফলে দেখা যায়, কোনো হাতেই আর্থ্রাইটিস হয়নি এবং দুই হাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্যও নেই।
অবশ্য এটি ছিল মাত্র একজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আঙুলের গিঁট ফাটান। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিবারের ‘পপ’, ‘ক্লিক’ বা ‘ক্র্যাক’ শব্দ কি ভবিষ্যতে জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে?
গিঁট ফাটালে আসলে কী ঘটে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি মূলত জয়েন্টের ভেতরে থাকা তরলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দুটি হাড় যেখানে মিলিত হয়, সেটিই জয়েন্ট। আঙুলের গিঁটসহ শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ‘সাইনোভিয়াল ফ্লুইড’ নামে এক ধরনের তরল থাকে। এটি অনেকটা ডিমের সাদা অংশের মতো এবং জয়েন্টে লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করে।
আঙুল টানলে, বাঁকালে বা মোচড়ালে জয়েন্টের ভেতরের জায়গা সাময়িকভাবে প্রসারিত হয়। এতে সাইনোভিয়াল ফ্লুইডের চাপ কমে যায় এবং তরলের মধ্যে দ্রবীভূত গ্যাস থেকে ছোট ছোট বুদ্বুদ তৈরি হয়। জয়েন্ট ফাটার সময় যে শব্দ শোনা যায়, সেটি মূলত এসব বুদ্বুদের আকস্মিক পরিবর্তন বা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শব্দটি কখনো কখনো বেশ জোরালোও হতে পারে। গবেষণায় এমন শব্দের মাত্রা প্রায় ৮৩ ডেসিবেল পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা কাছ দিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৬৪ কিলোমিটার গতিতে চলা একটি ডিজেল ট্রাকের শব্দের কাছাকাছি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জয়েন্ট ফাটার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাদের কাছে সেই মুহূর্তটি অনেকটা পর্দায় আতশবাজি বিস্ফোরণের মতো মনে হয়েছিল।
সাধারণত ক্ষতিকর নয়
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের রিউমাটোলজিস্ট কিম হাইরিখের মতে, জয়েন্ট থেকে শব্দ হওয়া মূলত একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
তবে ব্যথা বা জয়েন্ট ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের নিউরোসার্জন জে জগন্নাথনের মতে, অতিরিক্ত জোরে বা ভুলভাবে আঙুল ফাটালে বিরল ক্ষেত্রে আঘাত, মচকানো কিংবা টেন্ডনের সমস্যা হতে পারে। ১৯৯৯ সালে ফিলাডেলফিয়ার এক হাতের সার্জন এমন দুই রোগীর ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন, যারা অতিরিক্ত জোরে আঙুল ফাটাতে গিয়ে আঙুলে মচকানোর শিকার হয়েছিলেন।
তবে স্বাভাবিকভাবে ও কম জোরে আঙুলের গিঁট ফাটানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল।
গিঁট ফাটালে কি আর্থ্রাইটিস হয়?
এটাই সম্ভবত আঙুলের গিঁট ফাটানো নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভয়। তবে চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, নিয়মিত গিঁট ফাটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হওয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
১৯৭৫ সালের একটি গবেষণায় ২৮ জন নার্সিং হোমের বাসিন্দাকে নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, নিয়মিত আঙুল ফাটানো ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষয়জনিত আর্থ্রাইটিসের হার অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নয়।
আরও সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ২১৫ জন রোগীর দীর্ঘদিনের আঙুল ফাটানোর অভ্যাস পর্যালোচনা করা হয় এবং তাদের এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যাদের এই রোগ ছিল না। গবেষণাতেও দেখা যায়, জীবনে কত বছর বা কত ঘন ঘন আঙুল ফাটানো হয়েছে, তার সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকির কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ঘাড় ফাটানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
আঙুলের গিঁট ফাটানো সাধারণত ক্ষতিকর না হলেও ঘাড় বা পিঠের জয়েন্ট ফাটানোর বিষয়টি আলাদা।
ঘাড়ের ভেতর দিয়ে মেরুদণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু চলাচল করে। এ ছাড়া ঘাড়ের পেছন দিয়ে মস্তিষ্কের দিকে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধমনি রয়েছে।
তাই অতিরিক্ত জোরে ঘাড় মোচড়ানো বা ফাটানো থেকে গুরুতর আঘাত হতে পারে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ঝিনঝিন করা, মাথা ঘোরা কিংবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা নিজের হাতে ঘাড় ফাটানোর পরামর্শ দেন না। এমনকি পেশাদারদের মাধ্যমে ঘাড়ের ম্যানিপুলেশন বা চিরোপ্র্যাকটিক চিকিৎসা নিয়েও চিকিৎসা মহলে বিতর্ক রয়েছে।
গিঁট ফাটালে কি হাতের শক্তি কমে?
এ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা ধারণা রয়েছে। ১৯৯০ সালের একটি গবেষণায় ৭৪ জন নিয়মিত গিঁট ফাটানো ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাদের হাতের মুঠির শক্তি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম এবং হাতে ফোলাভাব বেশি।
তবে ২০১৭ সালের আরেকটি গবেষণায় আগের ফলাফলকে সমর্থন করা হয়নি। সেখানে আঙুল ফাটানোর অভ্যাসের সঙ্গে হাতের মুঠির শক্তি কমে যাওয়ার কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া নিয়মিত গিঁট ফাটালে আঙুলের গিঁট বড় হয়ে যায় বা টেন্ডন ঢিলে হয়ে যায়—এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আল্ট্রাসাউন্ড গবেষণাতেও নিয়মিত গিঁট ফাটানো ব্যক্তিদের আঙুলে কোনো উল্লেখযোগ্য ফোলাভাব বা অক্ষমতা পাওয়া যায়নি।
কেন অনেকে গিঁট ফাটিয়ে স্বস্তি পান?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গিঁট ফাটানোর পর সাময়িক স্বস্তি বা জয়েন্টের নড়াচড়া বাড়ার অনুভূতি হতে পারে। কারণ, জয়েন্টটি কিছুটা প্রসারিত হয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় পরিসরে নড়াচড়া করতে পারে।
আরেকটি ধারণা হলো, গিঁট ফাটানোর সময় জয়েন্টের আশপাশের স্নায়ুপ্রান্ত উদ্দীপিত হয়ে পেশি কিছুটা শিথিল হতে পারে এবং ব্যথা কমার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তবে এই তত্ত্ব এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভ্যাস ছাড়তে চাইলে কী করবেন?
গিঁট ফাটানো সাধারণত ক্ষতিকর না হলেও কেউ যদি এই অভ্যাস ছাড়তে চান, তাহলে নিজের আচরণের কারণ শনাক্ত করা সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, কখন গিঁট ফাটানোর প্রবণতা বাড়ে তা খেয়াল করতে। যেমন—মানসিক চাপ, একঘেয়েমি কিংবা অজান্তেই এই অভ্যাসটি হচ্ছে কি না।
হাত ব্যস্ত রাখতে স্ট্রেস বল, ফিজেট টয় বা অন্য কোনো নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে আচরণগত বা কগনিটিভ থেরাপির মাধ্যমেও অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যায়।
শেষ কথা
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিকভাবে আঙুলের গিঁট ফাটানো নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণায় এর সঙ্গে আর্থ্রাইটিস, হাতের শক্তি কমে যাওয়া বা স্থায়ী জয়েন্ট ক্ষতির সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
তবে গিঁট ফাটানোর সময় ব্যথা, ফোলাভাব বা অস্বাভাবিক অস্বস্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর ঘাড় জোরে মোচড়ানো বা ফাটানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সবশেষে রিউমাটোলজিস্ট কিম হাইরিখের বক্তব্যের সারকথা হলো—গিঁট ফাটানো সাধারণত জয়েন্টের ক্ষতি করে না; বরং অতিরিক্ত শব্দে বিরক্ত হতে পারেন আশপাশের মানুষই!
সূত্র: বিবিসি
ব্রেকিং