আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯:৩০, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রায় চারজনের একজন ব্রুক্সিজমে আক্রান্ত, অথচ বেশিরভাগই জানেন না যে তারা দাঁত ঘষেন-ছবি/ বিবিসি
লা মনে করতে পারেন না, রাতে ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা তার ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল। তবে চোয়ালে অসহ্য ব্যথা, মাথাব্যথা এবং তার দাঁতের মোলারগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে—এসব বিষয় স্পষ্ট মনে আছে।
“আমি প্রচণ্ড ব্যথায় ছিলাম। আমার মুখের আকৃতি বদলে যাচ্ছিল এবং দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, এ বিষয়ে আমাকে কিছু একটা করতেই হবে,” বলেন এলা।
৩১ বছর বয়সী এলা ব্রুক্সিজমে আক্রান্ত। এ অবস্থায় নিয়মিত ও অনেক সময় তীব্রভাবে দাঁত ঘষা বা চেপে ধরার প্রবণতা দেখা যায়। তবে সম্প্রতি চিকিৎসা নেওয়ার পর তার জীবন “নিঃসন্দেহে বদলে গেছে” বলে জানান তিনি।
ব্রিটেনে এলার মতো লাখো মানুষ ব্রুক্সিজমে ভুগছেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতি চারজনের একজন এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। তবে অনেকেই উপসর্গ দেখা না দেওয়া পর্যন্ত বিষয়টি বুঝতে পারেন না।
ব্রিটিশ ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ব্রুক্সিজম বাড়ছে—এমন কিছু অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে কয়েকজন দন্তচিকিৎসক বিবিসিকে জানিয়েছেন, দাঁত ঘষার কারণে দাঁতের সমস্যায় আক্রান্ত তরুণ রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় তারা উদ্বিগ্ন।
ব্রিটিশ সোসাইটি অব ডেন্টাল স্লিপ মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট ডা. অদিতি দেশাই বলেন, “এটি নিশ্চিতভাবেই বাড়ছে। আর বর্তমান সময়ে জীবনযাপন এতটাই চাপপূর্ণ হওয়ায় এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
এলা জানান, দীর্ঘদিন দাঁত ঘষার কারণে তার চোয়ালের ম্যাসেটার পেশি বড় হয়ে যায় এবং মুখের চোয়াল চওড়া দেখাতে শুরু করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ মানসিক চাপের কারণে দাঁত ঘষেন। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনের চাপ কেন চোয়ালের ওপর এমন প্রভাব ফেলে? এ সমস্যা থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়? আবার কিছু ক্ষেত্রে দাঁত ঘষা কি উপকারীও হতে পারে?
ব্রুক্সিজম কী?
ব্রুক্সিজম একটি বিস্তৃত শব্দ, যার মধ্যে চোয়ালের চার ধরনের নড়াচড়া অন্তর্ভুক্ত—দাঁত চেপে ধরা, ঘষা, শক্ত করে ধরে রাখা এবং সামনে ঠেলে দেওয়া।
কেউ রাতে ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষেন, আবার কেউ দিনের বেলাতেও এটি করেন। কেউ খুব কমই বুঝতে পারেন যে তারা এমন করছেন। আবার কেউ এত জোরে দাঁত ঘষেন যে মাউথগার্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় এবং পাশে ঘুমানো ব্যক্তির ঘুমও ভেঙে যায়।
কীভাবে বুঝবেন আপনার ব্রুক্সিজম আছে?
এর কিছু লক্ষণ হলো—
দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া বা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া
সকালে মাথাব্যথা বা মুখে ব্যথা
চোয়ালে শক্তভাব
ঘুমের ব্যাঘাত ও দিনের বেলায় ক্লান্তি
দাঁতের সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়া
কোনো সংক্রমণ ছাড়াই কানে বা কানের পাশের অংশে ব্যথা
ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাইকোথেরাপির মতে, থেরাপিতেও দাঁত ঘষার বিষয়টি আগের তুলনায় বেশি উঠে আসছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছে, মানুষ এখন মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক সম্পর্কে বেশি সচেতন।
সাইকোথেরাপিস্ট রাহি পোপাট বলেন, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এমন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, যারা নিজেরা বা তাদের কাছের কেউ লক্ষ্য করেছেন যে তারা দাঁত ঘষছেন। অনেকেই পরে বুঝতে পারেন, জীবনের অত্যন্ত চাপপূর্ণ সময়ের সঙ্গে তাদের দাঁত ঘষার অভ্যাস শুরু বা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
‘চাপ মুক্তির একটি উপায়’
রাহি পোপাটের মতে, মানসিক আঘাত ও চাপ মানুষকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’। এ সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শরীরে অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয় এবং পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায়।
চোয়াল ও স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এ সময় চোয়ালের পেশিও সক্রিয় হয়ে দাঁত চেপে ধরা ও ঘষার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
পোপাট বলেন, রাতে ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা দিনের বেলায় জমে থাকা চাপ ও উত্তেজনা শরীরের কিছুটা মুক্ত করার একটি উপায় হতে পারে।
এলার ক্ষেত্রেও ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা জেগে থাকা অবস্থায় জমে থাকা মানসিক চাপ মুক্ত করার একটি উপায় হয়ে উঠেছিল।
“আমি জানি, এটা আমার মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার উদ্বেগের মাত্রা অনেক বেশি—তবে আমাকে দেখলে সেটা বোঝার উপায় নেই। আমি ব্যস্ত থাকি এবং বিষয়টি আড়াল করতে অনেক বাইরে যাই,” বলেন এলা।
২০-এর দশকে তিনি ব্যথা সহ্য করেই চলতেন। কিন্তু কয়েক বছর পর দন্তচিকিৎসক যখন জানান, তার দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন এলা চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বোটক্সে কমেছে চোয়ালের চাপ
এলার চোয়ালের পেশিতে বোটক্স ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে চোয়ালের পেশি শিথিল হয় এবং মুখের পেশিতে চাপ কমে আসে। এই চিকিৎসা সাধারণত ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএসে এই চিকিৎসা নিয়মিতভাবে দেওয়া হয় না। তাই এলা নিজ খরচে দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসাটি নেন।
তিনি বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে আমি ভালোভাবে ঘুমাতে পারছি। সকালে আমার শক্তি অনেক বেড়েছে, ব্যথা কমেছে এবং আমার মুখও আগের মতো চৌকো দেখাচ্ছে না।”
দন্তচিকিৎসক ডা. সাইমন কোভ বলেন, দাঁত ঘষার কারণে দাঁতের ওপর শারীরিক প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
তিনি রোগীদের দাঁত পরীক্ষা করতে থ্রিডি স্ক্যানার ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে দাঁত কতটা ক্ষয়ে গেছে তা দেখা যায়।
তিনি বলেন, “অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা দাঁত ঘষছেন। পরে আমরা এসে ক্ষতিটা দেখতে পাই। দাঁত যদি এতটাই ক্ষয়ে যায় যে বড় ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল হতে পারে এবং খরচও কয়েক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।”
তবে তার মতে, এমন গুরুতর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল এবং এ ধরনের ক্ষতি তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
শুধু মাউথগার্ড পরলেই সমাধান নয়
দাঁতের ক্ষতি ঠেকাতে রাতে মাউথগার্ড ব্যবহার করে ব্রুক্সিজমের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ডেন্টাল স্লিপ বিশেষজ্ঞ ডা. অদিতি দেশাই।
তার মতে, অনেক সময় কারণ না খুঁজেই দন্তচিকিৎসকরা রোগীকে মাউথগার্ড দিয়ে দেন।
তিনি বলেন, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ)-এর মতো গুরুতর অন্তর্নিহিত সমস্যাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে গেলে রোগী আবার শ্বাস নেওয়ার জন্য সেই বাধা সরাতে দাঁত ঘষতে পারেন।
ব্রুক্সিজম নিয়ে গবেষণাকারী অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক লবেজো বলেন, “এটি একটি ভালো উদাহরণ যে কিছু ক্ষেত্রে ব্রুক্সিজম মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।”
তবে দাঁত ক্ষয়, ঘুমের ব্যাঘাত ও চোয়ালে ব্যথার মতো নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও ব্রুক্সিজম সবসময় ক্ষতিকর নয় বলেও তিনি জানান।
লবেজো বলেন, ব্রুক্সিজম লালা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চোয়ালের পেশি নড়াচড়া করলে বড় লালাগ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়। এতে মুখ পরিষ্কার থাকে, দাঁত সুরক্ষিত থাকে এবং হজমের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিবানোর সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
লবেজো বলেন, প্রাণীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি জানা গেছে এবং মানুষের ওপর তাদের প্রাথমিক গবেষণাতেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। চোয়ালের পেশি ব্যবহার করলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়তে পারে।
তবে দাঁত ঘষার কারণে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাও তৈরি হতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রুক্সিজমের চিকিৎসা কী?
প্রোস্থোডন্টিক্স বিশেষজ্ঞ দন্তচিকিৎসক রিয়াজ ইয়ার গুরুতর ব্রুক্সিজমের কারণে দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া, ফেটে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া এবং বারবার দাঁতের চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার সমস্যায় থাকা রোগীদের চিকিৎসা করেন।
অনেক রোগী দীর্ঘস্থায়ী চোয়াল বা মুখের ব্যথা এবং ঘুমের সমস্যার কথাও জানান। তবে এসব সমস্যাকে শুধু দাঁত ঘষার ফল হিসেবে না দেখে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
ইয়ার বলেন, আগে দাঁত ঘষাকে চোয়ালের একটি সাধারণ যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত একটি ‘বায়োসাইকোসোশ্যাল’ সমস্যা, যেখানে একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনযাপনও ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, রোগীর ঘুমের ধরন, খাদ্যাভ্যাস, ওজন, ব্যায়ামের পরিমাণ, কী ধরনের ওষুধ গ্রহণ করছেন এবং ঘুমের কোনো সমস্যা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়। কারণ অনেকগুলো কারণ একজন ব্যক্তির দাঁত ঘষার প্রবণতায় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন।
যেসব চিকিৎসা সহায়ক হতে পারে
রাতে দাঁত রক্ষার জন্য মাউথগার্ড ব্যবহার
স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সিপ্যাপ মেশিন বা ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইস (এমএডি) ব্যবহার
ফিজিওথেরাপি
সিবিটি বা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির মতো কাউন্সেলিং
ব্যায়াম, অ্যালকোহল কমানো, ধূমপান বন্ধ করা ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো এবং ঘুমের উন্নতি
গুরুতর ক্ষেত্রে বোটক্স ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এটি এনএইচএসে খুব কমই পাওয়া যায়
চোয়ালের পেশি শিথিল করার ইনজেকশনের পাশাপাশি এলা তার উদ্বেগ কমাতে মেডিটেশনও করছেন। নিয়মিত জমে থাকা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
এলা বলেন, “চিকিৎসা আমার জীবন বদলে দিয়েছে। এখন আমি সমস্যাটির মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে চাই।”
সূত্র: বিবিসি
ব্রেকিং