বারবার মনোযোগ হারাচ্ছেন? ব্রেইন ফগ কাটানোর সহজ উপায়

আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ০০:১০, ৭ আগস্ট ২০২৬

বারবার মনোযোগ হারাচ্ছেন? ব্রেইন ফগ কাটানোর সহজ উপায়

ছবি/ বিবিসি

ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ কিংবা মানসিক উদ্বেগের কারণে অনেক সময় হঠাৎ কোনো ঘরে গিয়ে ভুলে যান কেন গিয়েছিলেন, কথা বলতে বলতে কী বলতে চেয়েছিলেন তা মনে থাকে না, কিংবা সাধারণ কাজেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সপ্তাহান্তের ছুটির পর আবার কাজ বা পড়াশোনায় ফিরলেও অনেকের এমন অভিজ্ঞতা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে **‘ব্রেইন ফগ’** বলা হয়। এটি কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়; বরং এমন কিছু মানসিক ও জ্ঞানীয় সমস্যার সমষ্টি, যার মধ্যে রয়েছে মনোযোগের ঘাটতি, ভুলে যাওয়া, ধীরগতিতে চিন্তা করা এবং মানসিক অস্পষ্টতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেনোপজ বা পেরিমেনোপজ, লং কোভিড, লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে ব্রেইন ফগ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি ও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসও এর অন্যতম কারণ।

যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক ও **Morning Live** অনুষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ **ডা. থারাকা** ব্রেইন ফগ দূর করতে কয়েকটি সহজ কিন্তু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন।

## নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন

ডা. থারাকার মতে, ব্রেইন ফগ যে কারও হতে পারে। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা অযোগ্যতার লক্ষণ নয়। বরং এটি মস্তিষ্কের একটি সংকেত, যা জানায় যে আপনি ক্লান্ত, অতিরিক্ত চাপে আছেন অথবা বিশ্রামের প্রয়োজন।

তাই নিজেকে দোষারোপ না করে মনে রাখুন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্রেইন ফগ সাময়িক। প্রয়োজন হলে কাজের গতি কমান, দায়িত্ব ভাগ করে নিন এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নিন। সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

## নিয়মিত রুটিন গড়ে তুলুন

প্রতিদিনের কাজের একটি নির্দিষ্ট রুটিন থাকলে মস্তিষ্কের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ কমে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করলে মনোযোগ বাড়ে এবং ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমে।

এমনকি আগের রাতেই পরদিনের পোশাক গুছিয়ে রাখা বা সকালের নাশতার প্রস্তুতি নিয়ে রাখার মতো ছোট ছোট অভ্যাসও মস্তিষ্ককে অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের চাপ থেকে মুক্ত রাখে।

## কাজের মাঝে বিরতি নিন

একটির পর একটি মিটিং, কাজ বা ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের কারণে অনেকেই দিনের পুরো সময়টিকে ব্যস্ততায় ভরে ফেলেন। এতে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায় না এবং ব্রেইন ফগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতিটি কাজের মাঝখানে অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিটের বিরতি রাখা উচিত। এ সময় একটু হাঁটা, শরীর প্রসারিত করা, পানি পান করা, বাইরে কিছুক্ষণ হাঁটা বা শান্তভাবে বসে থাকা মস্তিষ্ককে নতুন করে মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

## ক্যালেন্ডার ও রিমাইন্ডারের সাহায্য নিন

সব কাজ, সময়সূচি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখার চেষ্টা করলে মানসিক চাপ আরও বাড়ে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

মোবাইল বা কম্পিউটারের ক্যালেন্ডার, রিমাইন্ডার এবং টু-ডু লিস্ট ব্যবহার করলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। নিয়মিত বিল পরিশোধ, অফিসের কাজ বা দৈনন্দিন দায়িত্বের জন্য স্বয়ংক্রিয় রিমাইন্ডার সেট করে রাখলে মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় চাপমুক্ত থাকে।

## ‘SWANS’ পদ্ধতিতে সুস্থ রাখুন মস্তিষ্ক

দৈনন্দিন অভ্যাসের পাশাপাশি ডা. থারাকা **SWANS** নামের একটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতিটি অক্ষর মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসকে নির্দেশ করে।

**S – Sleep (ঘুম):** প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, স্মৃতিশক্তি শক্তিশালী করে এবং মনোযোগ বাড়ায়।

**W – Water (পানি):** শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। সামান্য পানিশূন্যতাও মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি।

**A – Activity (শারীরিক কার্যক্রম):** নিয়মিত হাঁটা, হালকা দৌড়, ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করলে মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ে, যা চিন্তাশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।

**N – Nutrition (পুষ্টিকর খাদ্য):** অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে পুষ্টিকর ও প্রাকৃতিক খাবার খাওয়া উচিত। বিশেষ করে কোলিনসমৃদ্ধ ডিম, মাছ ও বাদাম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক।

**S – Stress (মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ):** দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা চিন্তাভাবনাকে অস্পষ্ট করে তুলতে পারে। তাই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন, মননশীলতা চর্চা এবং পছন্দের শখে সময় দেওয়ার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা উচিত।

### বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেইন ফগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক এবং জীবনযাপনের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
 

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন