মির্জা ফখরুল দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮:৩৯, ২০ আগস্ট ২০২৬

মির্জা ফখরুল দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত

ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

এর মধ্য দিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ পড়াবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুল দিয়ে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানান।

সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন। প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ চলে। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় সরাসরি ভোটের আয়োজন করতে হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জনসহ মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৪৩টি ভোট পড়েছে।

দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নিয়ম ও নির্দেশনা তুলে ধরেন। পরে পর্যায়ক্রমে সংসদ সদস্যরা ভোট দেন।

ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেন।

তৃণমূল থেকে বঙ্গভবন

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৯ সালের দিকে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

বিএনপির মহাসচিব

মির্জা ফখরুল ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। দুই বছর পর ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে যুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে আসেন।

২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক অনুপস্থিতির বিভিন্ন সময়ে দেশের ভেতরে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকার পাশাপাশি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন তিনি।

মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিনি কৃষি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী এই নেতা।

পারিবারিক পরিচয়

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাবার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করলেও মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ।

আরও পড়ুন