নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০০:৩৯, ১৬ আগস্ট ২০২৬
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের পর আহতদের উদ্ধার করে নিয়ে আসেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। তাদের মুখে ছিল /ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে নয়জনের মৃত্যুর এক দিন পরও দুর্ঘটনাস্থল পুরোপুরি গ্যাসমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। শনিবার দিনভর বিশেষজ্ঞরা কাজ করেও জাহাজের দুর্ঘটনাকবলিত অংশে গ্যাসের মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নামাতে পারেননি।
বিকালে পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্যাস অপসারণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রোববার আবারও গ্যাসমুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করা হবে।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে বৈঠক করেছে। কমিটির সদস্যরা রোববার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি পরিদর্শন করবেন।
শনিবার দুপুরে ইয়ার্ড পরিদর্শন করেন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও অবহেলা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যে ট্যাংকে জমেছিল বিষাক্ত গ্যাস
প্রায় ২৮০ মিটার দীর্ঘ এলএনজিবাহী ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি ভাঙার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে আনা হয়।
শুক্রবার সকালে জাহাজটির নিচের একটি অংশ কাটার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। একটি ট্যাংকারের অংশ কাটার পর সেটি সরানোর সময় বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে কয়েকজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও কয়েকজন একইভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এ ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও সাতজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, জাহাজটি তীরে ভেড়ানোর সময় কার্গো ট্যাংক পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। তবে দুর্ঘটনাটি কার্গো ট্যাংকে নয়, একটি ওয়াটার ট্যাংকে ঘটেছে। সেখানে কীভাবে এবং কেন গ্যাস জমেছিল, তদন্তের পর তা জানা যাবে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থলে মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে হাইড্রোজেন সালফাইডের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই বিষাক্ত গ্যাসকেই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
৮৪ পিপিএম গ্যাসের উপস্থিতি
দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা জাহাজটির ওই অংশে গ্যাস অপসারণের কাজ শুরু করেন। তবে শনিবার বিকাল পর্যন্ত কাজ করেও সেখানে গ্যাসের মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নামানো সম্ভব হয়নি।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন জানান, হাইড্রোজেন সালফাইড ভারী গ্যাস এবং পানির সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। এটি অপসারণের জন্য পানি ব্যবহার প্রয়োজন হলেও ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় শনিবারের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাল্টি গ্যাস ডিটেক্টরে শনিবার বিকালে দুর্ঘটনাস্থলে ৮৪ পিপিএম হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া যায়। গ্যাসের মাত্রা বেশি থাকায় ওই দিন আর কাজ চালানো হয়নি। রোববার পুনরায় কাজ শুরু করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার জানান, দুর্ঘটনাস্থলে পানি দেওয়ার পর বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা কমছিল। পরে আবার গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় কাজ বন্ধ রাখা হয়।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জাহাজের দুর্ঘটনাকবলিত অংশে জমে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড জোয়ারের পানির সঙ্গে মিশে আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নিরাপত্তা ঘাটতিতে আগেই মামলা
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতির অভিযোগে গত জুলাইয়ে মামলা হয়েছিল। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে যথাযথ সচেতনতার ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন না দেওয়া এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করানোর পরও ওভারটাইমের অর্থ না দেওয়ার মতো অনিয়ম ধরা পড়ে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে এসব অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ বিভিন্ন বিষয় দেখা হয়। নিরাপত্তাজনিত কিছু ঘাটতি পাওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, কোনো জাহাজ কাটার আগে সেটিকে গ্যাসমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। দুর্ঘটনার আগে জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, তা বিশেষজ্ঞদের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ
এদিকে দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রাণহানির পর ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডটির কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি তথ্য সংগ্রহ ও পরিদর্শনের পর তাদের প্রতিবেদনে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণ করবে।
ব্রেকিং