প্রকাশ: ১৬:৩৯, ১১ জুলাই ২০২৬
প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ খাতের উন্নয়নের জন্য হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রকল্পেই উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক কর্মকর্তা নিজের স্ত্রীর নামে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সরকারি অনুদানের ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু এটিই নয়—মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে প্রায় ৬৭ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পের ১৭টি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অনুদান বিতরণ, টেন্ডারে কারসাজি করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে গাড়ি কেনা, অকার্যকর পানির পাম্প ক্রয় এবং অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার অভিযোগ।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ
২০১৯ সালে শুরু হওয়া 'দ্য লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)' বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। ৬১ জেলার ৪৬৫ উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মেয়াদ ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যয় পর্যালোচনা করে সিএজি কার্যালয় অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে অর্থ আদায়ের সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান, অনুদান গেল কর্মকর্তার হাতে
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইউসুফ হাবিবকে ঘিরে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের স্ত্রী কান্তার নামে 'শনপাপড়ি মিঠাই ঘর' নামে একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ম্যাচিং গ্র্যান্ট অনুমোদন করান।
সিএজির সরেজমিন তদন্তে দেখা যায়, ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই নেই। প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত খামারি বা উদ্যোক্তা না হয়েও কান্তার নামে অনুদান অনুমোদন করা হয়।
বিষয়টি আরও নাটকীয় মোড় নেয়, যখন কান্তা নিজেই স্বীকার করেন—বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনুদানের টাকা প্রথমে তাঁর ব্যাংক হিসাবে এলেও পরে সাবেক স্বামী ডা. ইউসুফ হাবিব নিজের হিসাবে নিয়ে নেন। এমনকি ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি বাসাবাড়িকে মিঠাই ঘর সাজিয়ে ছবি তোলার কথাও তিনি স্বীকার করেন।
অন্যদিকে ডা. ইউসুফ হাবিব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, প্রকল্পের নিয়ম মেনেই অনুদান দেওয়া হয়েছিল এবং বর্তমানে তালাক হওয়ায় তাঁর সাবেক স্ত্রী মিথ্যা অভিযোগ করছেন।
দুই ঠিকানায় খোঁজ, মিলল না প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব
অনুদানের আবেদনপত্রে ব্যবহৃত মুলগাঁও ও বাঘারপাড়া—উভয় ঠিকানাতেই অনুসন্ধান চালিয়ে 'শনপাপড়ি মিঠাই ঘর' নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি সিএজির পরিদর্শনের সময় উপস্থিত স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও জানান, তিনি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান কখনও দেখেননি।
১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার অনুদান, নেই যন্ত্রপাতি
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে 'মেসার্স কেসি এগ্রো' নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ম্যাচিং গ্র্যান্ট দেওয়া হলেও তদন্তে দেখা যায়, অনুদানের শর্ত পূরণই করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
নথিতে উল্লেখ থাকা ফ্রিজার ভ্যান, দই তৈরির মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুয়া পরিদর্শন প্রতিবেদন ও বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের অভিযোগও উঠেছে।
গাড়ি কেনায় সরকারের ৩৪ কোটি টাকার ক্ষতি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এসেছে গাড়ি কেনায়।
অর্থ বিভাগের নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রতিটি ২,৫০০ সিসির ডাবল কেবিন পিকআপের ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ প্রকল্পে একই গাড়ি কেনা হয়েছে ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।
মোট ১১৫টি গাড়ি কেনায় সরকারের অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
১৭ কোটি টাকার পাম্প, কাজে লাগল না
প্রকল্পের আওতায় ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬ হাজার ৩২০টি পানির পাম্প কেনা হলেও অধিকাংশই অকেজো বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
কম ক্ষমতার হওয়ায় এসব পাম্প দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে বেশিরভাগ পাম্পই এখন অব্যবহৃত কিংবা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
এই অনিয়মের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকেই অর্থ আদায়ের সুপারিশ করেছে সিএজি।
টেন্ডারে কারসাজি, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুদান
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফিড ট্রলি ও ল্যাকটোমিটার কেনায় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে উচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে সরকারের ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া টাঙ্গাইলের সখীপুরে 'মেসার্স মিনিস্টার ফিডস' নামে একটি অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। তদন্তে দেখা যায়, সেটি কার্যত একটি গোডাউন; সেখানে কোনো ফিড উৎপাদনের কার্যক্রম নেই।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল বলেন, অডিটের পর্যবেক্ষণের জবাব দেওয়া হচ্ছে। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
অন্যদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, অডিট প্রতিবেদন হাতে পেলেই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সব আর্থিক ক্ষতিই সরাসরি আত্মসাৎ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাঁর ভাষায়, এই প্রতিবেদন উন্নয়নের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির সংস্কৃতি কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তারই একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
ব্রেকিং